পয়লা বৈশাখ
বিষয়: ছোট গল্প
চন্দন চক্রবর্তী
ছেলেটা ঘুমিয়ে পড়েছে ! থাক ওকে আর ডেকে কাজ নেই । একেবারে খাওয়ার সময় তুললেই হবে । আরতী তাড়াতাড়ি কাজের বাড়ি থেকে বয়ে আনা খাবারের প্লাস্টিক প্যাকেটগুলো থালায় ঢেলে ছেঁড়া মশারীটা টাঙিয়ে দিলো । নতুন গরম পড়ছে,আর মশার উৎপাতটাও বেড়েছে । ছেলেটা কতক্ষন মশার কামড় খাচ্ছে কে জানে !
এবার কলতলা থেকে জল এনে একটু গায়ে না ঢাললেই নয় ! গরমে সেখানেও ভিড় । চানটা সেরে ঘরে এসে কাপড় ছেড়ে তৈরি হতে একটা ঘন্টা লেগে গেল ! বেড়ার ঘরে দেয়ালে ঝোলানো মায়ের ছবিটায় একটা ধুপকাঠি দেখিয়ে,এবার একটু মেঝেতে বসে খুব বড় করে আরতী একটা শ্বাসটা ছাড়লো ।
সবিতাদি বলেছিলেন পয়লা বৈশাখে মায়নাটা বাড়াবেন । গেলবার ছেলের নতুন বছরের জামাটা দিদিই দিয়েছেন । এবার সেই দিদি নেই ! গতমাসে ওরা এখান থেকে অন্য পাড়ায় চলে যাওয়ায় কাজটাও গ্যাছে ।
ওর বিপদের দিনে আরতী কি না করেছে ! দিদিও এযাবৎ আরতীকে এটা ওটা দিয়ে সাহায্য করে এসেছেন । ওরা চলে যাবার সময় আরতী কাঁদছিলো দেখে দিদি ওকে স্বান্তনা দিচ্ছিলেন । কিন্তু দূরে সরে গেলে কি আর সম্পর্কটা থাকে !
নতুন কাজ একটা পেলেও পয়লা বৈশাখে ওরা হাত উল্টেছে । বাকি তিন বাড়ির দেয়া টাকায় ছেলের জামা একটা কেনা যায় । কিন্তু কানের দুলটা বন্ধক দেওয়া, সেখানে কিছু না দিলেও নয় ! বিপদে আপদে ওটাই সহায় ।
সেবার ছেলেটার জ্বরে ডাক্তার দেখিয়ে যা খরচ হল ! ওটা বন্ধক না দিলে ছেলেটাকে আর বাঁচানো যেত না । ওটা ঘরে থাকলে আরতী বুকে একটু বল পায় । দুলটা ওর বিয়েতে মা দিয়েছিল । গলার চেন একটা ছিল,সেটা কবেই গ্যাছে ।
বিয়ের আগে একটা পায়ের মল ছিল না ! সেটা কোথায় গ্যাছে কে জানে !
মনে আছে ছোটবেলা বাবার হাত ধরে দোকানে দোকানে ঘুরে হালখাতা করার দিনগুলো । যা শরবত দিত না ! বরফ ভাসতো ! নতুন জামাটা কিনেই গন্ধ শুকতে কি যে ভালো লাগতো ! দোকানের লোকগুলো কি মিষ্টি করে খুকি বলে ডাকতো ।
আহা ছেলেটার কপালটা এতো খারাপ ! ও জানতেও পারলোনা নতুন বছর কি জিনিস ! না কালকে ওকে একটা জামা কিনে দিতেই হবে ।
আরতীর কপালটা খারাপ । স্কুলে পড়তে পড়তে বাবা মারা গেল । মায়ের সংসারে টানাপোড়েনের মধ্যে ভালো করে খাওয়াই জুটতো না,পড়াশুনাতো বাহুল্য ! বিয়ে হল সেও এক বিড়ি শ্রমিকের সাথে । বুকের দোষে লোকটা অকালে চলে গেল । তারপর থেকে আরতীর জীবনে শুধু সংগ্রাম আর সংগ্রাম ।
বিয়ের পর দুটো বছর ভালোই কেটেছে । অভাব তখনও ছিল । তবুও মানুষটা ছিল,খোকাও হল । না আরতীর জীবনে এখন আর কোন বৈচিত্র নেই । মুখের অন্নটুকু জোগাড় করতেই সারাদিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খাটতে হয় ।
তারপরেও আছে অপমানের জ্বালা । মাথা উঁচু করে চলাটাওতো মনে অনেকটা শান্তি আনে !
হঠাৎ দেয়ালে মায়ের ছবিটা চোখে পড়লো । আরতী উঠে গিয়ে ছবিটার সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠলো,বল মা বল ! যখন পেটের ভাতটা ঠিক মত জোগাড় করতে পারি না তখন এইসব পূজো,পার্বণ কেন ? এইসব উৎসব আমাদের মানায় ? হা অন্ন মানুষের আবার পালা পার্বণ ! আমি এখন কি করবো ! ছেলেটা ঘুম থেকে উঠেই ওর নতুন জামাটা চাইলে আমি কি উত্তর দেব ? অবোধ শিশুকে কি করে বোঝাবো ? না আমি পারবো না ! তুই যখন সব বুঝিস তখন ওর উত্তর তুই দিবি । আর তা যদি না পারিস আমি টান মেরে তোকে ছিড়ে ফেলবো । বুঝবো তুই মিথ্যা । মিথ্যা আমার বিশ্বাস !
বাইরে কার যেন গলা পেয়ে আরতী চোখটা মুছে দরজায় গিয়ে দেখে নিবারণ ছেলেটা এসেছে !!
একটা প্যাকেট আর পাঁচশো টাকা দিয়ে ছেলেটা চলে গেল । বলে গেল সাবিতাদি পাঠিয়েছেন ।
আরতী ঘরে এসে মাটিতে বসে পড়ে,ছবিটার দিকে এক ভাবে তাকিয়ে রইলো ।
সারা শরীরটা কাঁপছে ! চোখের গরম জলটাও থেমে নেই !


2 Comments
বাস্তব চিত্র
ReplyDeleteঅসামান্য লেখা
দারুণ
ReplyDelete