মংপু ও মংপং
জয়শ্রী ঘোষ
8ই জুন অপরাহ্নের তিনটেয় কালিম্পং থেকে মংপু দেখতে চলি । আমাদের গাড়ির যে চালক সে শহর থেকে বেরিয়ে পাহাড়ের ঢালে গাড়ি দাঁড় করিয়ে এক মিনিটে আসছি বলে তরতর করে নীচে নামতে থাকে । তার গমনপথে চেয়ে থাকি ।পাহাড়ের খাঁজে তরুঝোপে ঢাকা একটা ছোট্ট কুঁড়ে থেকে একজন রমণী বেরিয়ে এসে চালকের হাত থেকে প্যাকেট নিয়ে ভিতরে চলে যায় । ড্রাইভার একমিনিটে উপরে এসে বলে এটা আমার বাড়ি। স্ত্রী এবং একমাত্র মেয়েকে নিয়ে আমার সংসার ।
মন মাতানো খুশিতে প্রকৃতিপ্রেমের হিল্লোলে
পাহাড়ী পথে সবুজের সমারোহে গাড়ি ছুটে চলে ।
নাম না জানা ফুলের সুবাস আর বাহারী সজ্জায়
স্বর্গীয় পরিবেশের আঁচ লাগে মজ্জায় মজ্জায় ।
দুই পাহাড়ের পদতলে এঁকেবেঁকে তিস্তা বহমান
দুরন্ত জলস্রোতের কুলুকুলু ধ্বনিতে কম্পমান ।
দুরে দেখি মেঘপরীদের উচ্ছাসে সূর্যালোক কাবু । চোখ ভরে নির্বাক বিস্ময়ে দেখে দেখে যাই ।পাহাড় , নদী মেঘের খেলা দেখে আমার মন নস্টালজিয়ার আবরণে জড়িয়ে কত অসম্ভব ঘটনার স্মরণে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে । আধঘণ্টা চলার পর হঠাৎ গাড়িকে থামতে হল । গাড়িতে বসে বসেই দেখলাম প্রায় এক কিমি পথ পর্যন্ত সারি দিয়ে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে । একটাও বড় গাড়ি নয় সবই ভ্রমণ পিয়াসীর ভ্রাম্যযান । ড্রাইভার নেমে জেনে এসে শোনালো এক ঘণ্টা আগে একটি গাড়ি গড়িয়ে তিস্তার গভীরে তলিয়ে গেছে । এখন পর্যন্ত যাত্রী ও গাড়ির হদিশ পাওয়া যায়নি । এই স্থানটি হল তিস্তার জলাধার প্রকল্প তাই গাড়ি কত গভীরে কোথায় গেছে নির্ণয় করা কঠিন । সেটা শুনে কম্পিত কলেবরে তিস্তার দিকে চেয়ে ভাবি এই তো জীবন ।খুশির আমেজে ঘুরতে এসে শেষ হয়ে গেল । দেহ খুঁজে না পাওয়া গেলে নিরুদ্দেশের খাতায় নাম লেখা হবে । এই পৃথিবীর প্রকৃতি প্রাণ মিলিয়ে বৈচিত্র্যের ধারা বইতে থাকবে পরম্পরায় আমরা যাব হারিয়ে ।
পাঁচ দশ মিনিট বাদে গাড়ি চলতে থাকে ।আমরা বিকাল চারটের সময় রাস্তার ধারে একটি হোটেলে দুপুরের ভাত পর্ব সেরে তিন চার কিমি পথ যাবার পরে চৌমাথার মোড়ে পৌছে মংপু নির্দেশক পথে পাহাড়ে উঠতে থাকি । খাঁড়া পাহাড়ের অপরূপ সৌন্দর্য । লতা পুষ্পালঙ্কারে শোভিত সড়ক । আশি বছর আগে এই সুউচ্চ পার্বত্যপথে রবীন্দ্রনাথ কিভাবে এসেছিলেন ! তখন যন্ত্র সভ্যতার মানে উন্নত যান ছাড়াই এখানে বসে বসে কাব্য সৃষ্টি করেছেন । মানুষের অভিধানে অসাধ্য শব্দটা ম্রিয়মাণ।
মংপু যাবার পথটি পুরোটা চড়াই । পাহাড়ের দশ কিমি উচ্চতায় রবীন্দ্রনাথের কাব্যভূমির কলাকৌশল । ছত্রিশ বছর পূর্বে দেখেছিলাম ফুলের বাগান আর একটি ছোট্ট ডরমিটরি আর আজ সুসজ্জিত অট্টালিকায় বিশ্বকবির স্মৃতিসমূহ পরিপাটি করে সাজান ।বাজার হাট , থাকার জন্য হোমস্টের ছড়াছড়ি ।
বৈকালিক সোনালী সুর্য নিজ রুপে বিহ্বল
পাহাড়ী পথে পথে সৌন্দর্য ছড়িয়ে চঞ্চল ।
পাহাড়ের পাহাড়ে সিঙ্কনা গাছের আধিপত্য ।প্রকৃতির অকৃপণ রুপে চড়াই পথের ক্লান্তি হারিয়ে চোখের আরামে সবকিছু উপভোগ করি । আজকের দিনটি মনে রাখার মত । আমাদের গাড়ির ড্রাইভার জানে না যে মংপু ও মংপং দুটি আলাদা জায়গা । মংপংতে সরকারি ফরেস্ট বাংলোয় আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা আছে । সে মংপুতে বাংলো খোঁজ করতে থাকে । আমরা বলি এখানে নয় মংপংতে । ড্রাইভার নিজেই এক স্থানীয় লোক মারফত লোকেশন জেনে নিয়ে কত রাত হয়ে যাবে বাড়ি ফিরতে সেই আক্ষেপে ফেটে পড়ে । সবার মুখে চোখে চিন্তার ছাপ । ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলি ভাড়া বেশি দেব । ড্রাইভার হাসিখুশি । হো হো হাসিতে বলতে থাকে.. কই বাত নেই ..আজ প্রথম জানলাম মংপংএর নাম ।
যে পথে উঠেছি সেই পথ ধরে গড়িয়ে গড়িয়ে নীচে নেমে পূর্বের সেই চৌমাথায় ফিরে সিকিম যাবার সড়কে গাড়ি ছুটতে থাকে ।তিস্তার তীরে তীরে নীল আকশের ফাঁকফোকরে পাহাড়ের আগল ভেঙে ঝর্ণার গতিবিধি গোচরে আসে । চল্লিশ মিনিট অতিক্রান্ত । তিস্তা নদীর করোনেশন ব্রীজে পৌঁছে যাই । ব্রীজ পেরিয়ে বাংলোর দূরত্ব পাঁচ কিমি । এই ব্রীজটিকে স্থানীয়রা বাঘপুল বলে জানে । ব্রীজের দু' মুখে দুটি বাঘের স্ট্যাচু । আর্চের আকারে ব্রীজটি পাথরের স্তরে আটকান ।
এবার তিস্তার দক্ষিণতীর ঘেঁসে চলি । বাঁদিকে সবুজ গাছে আচ্ছাদিত পাহাড় । আমরা প্রায় সমতলে । শিলিগুড়ি থেকে ছাব্বিশ কিমি দুরে WBFDC বাংলো । একত্রিশ নম্বর জাতীয় সড়কের ধারে ।এই পথ গেছে ভুটানের দিকে । এটা ডুয়ার্স যাবার দরজা । পুলিশি চেক পোস্ট থেকে বাংলোর দূরত্ব এক' শ মিটার হবে । সাড়ে ছ' টায় বাংলোর গেটে গাড়ি পৌঁছায় । তখনও চারিদিকে পড়ন্ত বিকেলের মধুর আলোয় উদ্ভাসিত তিস্তার প্রাঙ্গণ ।
গাড়ি থেকে নেমেই দেখতে থাকি বাংলোর অবস্থান । সূর্যাস্ত হয়েছে কিন্তু তার অবগুন্ঠিত আলোয় দিগ্বিদিক রোমাঞ্চিত । বাংলোটি তিস্তার চরে নির্মিত । স্থানটি মনোরম । উত্তর ও পূর্বে বড় বড় বৃক্ষ সমন্বিত পাহাড় আছে । দক্ষিণদিকে বহুদূর পর্যন্ত উন্মুক্ত তিস্তা উপত্যকা । চার পাঁচটি কুটীর ভ্রমণবিলাসীদের থাকার জন্য ভাড়া দেওয়া হয় । । । কুটীর গুলির চারপাশ গাছগাছালিতে ভরা । নদী স্রোতের মধুর শব্দে মনপ্রাণ মুখরিত । এখানে সেখানে শাল সেগুন গাছের নীচে চেয়ার টেবিল পাতা আছে । একটা লাল চেয়ারে বসে পড়ি যেগুলো আমাদের গ্রামেও নীলকমল কারখানায় তৈরী হয় । বসার সঙ্গে সঙ্গে বিড়াল ডাকার মত বেশ জোরাল এবং কর্কশ শব্দে সচকিত হয়ে নদীর চরায় বেড়ে উঠা উদ্ভিদ শ্রেণীর দিকে তাকিয়ে প্রাণীটিকে খোঁজার চেষ্টা করি । ভাবি এত তীব্র ডাক বেড়ালের হতে পারে না । বাংলোর কেয়ার টেকার বসন্ত ভদ্রলোক ভীষণ ভাল ।তাকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম এখানে প্রচুর ময়ূর আছে এবং ওটা ময়ূরের ডাক সন্ধ্যার আলো আঁধারিতে চেষ্টা করেও জাতীয় পাখির দর্শন পেলাম না । হঠাৎ রেলগাড়ির ঝমাঝম শব্দে চেয়ে দেখি আমি যেখানে বসে আছি তার নীচে রেল লাইনে ট্রেন আসছে । অবাক হয়ে দেখি তিস্তার কোল ঘেঁসে গোহাটি গামী ট্রেন ছুটে চলেছে । ঝোপ জঙ্গলের মাঝে তার এই অভিসারে রূপকথার গভীরে মন গেল হারিয়ে ।
অনৈসর্গিক শব্দ কর্ণকুহরে শুনি
চক্ষুর চাহনিতে পৃথিবীর রুপ চিনি ।
লম্বা বালুচর জেগে আছে অভয় দানে
তথাপি ভীত চকিত মত্ত করীর বৃন্হণে ।
আবছা আলোয় দূরের কটেজের সামনে তাকিয়ে মনে হল ভূত বসে আছে । কিছুক্ষণ দেখার পরে ভাবি সামনে গিয়ে দেখে আসি ভূতের মত ওটা কি! তাছাড়া রাত্রে মন খচখচ করবে । তার সন্মুখীন হয়ে দেখি মাটি থেকে দেড় ফুট উপরে কাটা গাছের গুঁড়িতে একটি ছোট টব যাকে মাথা মনে হয়েছিল । নিজের মনে হেসে ভাবলাম এভাবেই আমরা ভুত সৃষ্টি করে ভয়ের পরিবেশ গড়ে তুলি ।
কটেজে গিয়ে স্নান সেরে ফ্রেস হয়ে আবার বেরিয়ে পড়ি । পঞ্চমী চাঁদের ছটায় নদীর জল ছলাৎ ছলাৎ ভঙ্গিতে বাংলদেশের অভিমুখে সাপের মত হিলহিলিয়ে এগিয়ে চলেছে ।প্রকৃতির সাথে সাথে আধ্যাত্মিক ভাব এসে যায় । সারা পৃথিবী জুড়ে সজীব নির্জীব মিলিয়ে বৈচিত্র্যের শেষ নাই । আজ এখানে বসে রাতের জঙ্গল, নদীর রুপ দেখছি ।আগামীকাল কি হবে জানিনা ।
একসময় বসন্তবাবু এসে বলেন , দিদি , ভোরে উঠে তিস্তার উজান বরাবর পাঁচ মিনিট হেঁটে গেলে তিস্তা উপত্যকার একটি বড় চর দেখতে পাবেন সেখানে হাতির দল এসে মাতামাতি করে ।দুর থেকে দাঁড়িয়ে দেখবেন । খুব ভাল লাগবে ।
রাত নটায় বাংলোতলির বড় বড় শাল গাছের নীচে পায়চারী করছি এমন সময় ঝোপ থেকে মাটিতে লেজ দুলিয়ে ময়ূর তার রুপ দেখিয়ে আমার পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল । ধন্য হলাম ।
আমি ও সখা আমরা দুজনে কাক পক্ষীর ঘুম ভাঙার পুর্বেই তিস্তা চরের দিকে চলতে থাকি । কল্পনার কুহকে মনের মধ্যে ভয়ের সৃষ্টি করি । । সখার কথামত বাংলোর কাছাকাছি থাকি । পুব আকাশে ফর্সার নমুনা নজরপাতে চরার উদ্দেশ্যে চলি । চরে পৌঁছে জলের স্রোত , ব্রীজের গাম্ভীর্যতা ,চড়ার প্রসারতা , ওপারের শিলিগুড়িগামী গাছের আলিঙ্গনাবদ্ধ রাস্তায় গাড়ির গর্জন শুনে খুশি উপচে পড়ে । ভাগ্যে ছিল না তাই গজপতিদের গমনাগমন দেখতে পেলাম না ।
সন্তর্পণেএকত্রিশ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে এগিয়ে চেক পোস্টের কাছে একটিমাত্র দোকান পেলাম । মালিক মহিলা সবে অলিন্দ উন্মুক্ত করছেন । চা হবে কিনা জিজ্ঞাসা করতে গাছের নীচে পাতা চেয়ারে বসতে বলেন । দোকান ঝাঁটা দিয়ে পরিষ্কার করে ধুপ জ্বালিয়ে প্রণামান্তে স্টোভে চায়ের জল চাপায় । তাকিয়ে দেখি কয়েকফুট দুরে পুলিশ আগত লরিদের দাঁড় করিয়ে চেক করে তবেই যেতে দিচ্ছে । এই জায়গাটি ডুয়ার্সের দরজা
অপূর্ব স্বাদের চা পানে তৃপ্তি পেলাম ।
সকাল আটটায় বাংলো ছেড়ে যাবার কথা ছিল কিন্তু গতকাল দুপুরে ট্রেন বাতিলের সংবাদ মোবাইলে এসেছিল । মেয়ে তার বন্ধুর সাহায্যে বিকাল পাঁচটার নর্থ বেঙ্গল স্টেটবাসে বাড়ি ফেরার টিকিট পেতে সক্ষম হয় । বসন্তবাবু বলেন , বাংলো ফাঁকা , আজ টুরিস্ট বুকিং নেই । আপনারা লাঞ্চ খেয়ে দুটোর সময় যাবেন । এখানে দোকান বাজার নেই । শুধুই গাছ আর তিস্তা । গাছের নীচে চেয়ার টেবিল পাতা সেখানে বনভোজনের অনুভূতিতে উদরপূর্তি হল ।
ফিরে আসার সময় ভাবছিলাম কেয়ারটেকারের নিস্তরঙ্গ জীবনযাত্রা , মাঝে মাঝে হাতির হামলা , অতিথি অভ্যাগতদের থাকা খাওয়ার তদারকি। অর্জুন গাছের ছাল খসে পড়ার মত দু ' একদিন কাটিয়ে মানুষের নিজ ভূমে ফিরে যাওয়া এসব চলতে থাকবে ।


2 Comments
ঘরে বসে মানস ভ্রমণ
ReplyDeleteঅপূর্ব লেখা
দারুণ
ReplyDelete