জয়া সরকার



জলনূপুর
জয়া সরকার

দিনভর নিরবচ্ছিন্ন বৃষ্টি , টিপ টিপ টপ টপ টইটম্বুর জলে মাঠ ঘাট নতুন বাড়ির সদ্য ছাদ, ঘাসে ঘাসে পাতায় পাতায় সরস আলাপন , বারি বিন্দুতে ফুলদল রসবতী , দীঘির বুকে মুক্তা ঝরে পদ্মহাসির ।

ঘরের ভেতর আর একটা ঘর , সেখানে উঠে এসেছে লাল মাটির মেঠো পথ বাউল পায়ে পায়ে, দরজায় কড়া নাড়ে ঘন ঘন শ্বাস ,বেজে ওঠে টুং টাং হাতের একতারা ।

সীমান্তের পার্বত্য চড়াইটা আর দেখা যায় না ,
শুনেছি তার আগে তল তল দীর্ঘপ্রসারী অট্টালিকা সুন্দর সুন্দর ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে , ওখানেই কেউ কেউ খোলা আকাশের চাপা গাছটাকে টবে পুঁতে বটের পাতা গুনছে , এতেই নাকি তার ইষ্ট লাভ ।

তুমি এসো পাহাড় প্রমাণ মেঘ সরিয়ে মস্ত ভৈরবের মদিরায় ; মেঘের ডাকে ডাকে নদীর বাঁকে বাঁকে ,ওখানেই পাবে পাহাড় ছুঁয়ে থাকা জলের কিনারা ।

দীর্ঘদিনের  শায়িত তানপুরাটা ঝেড়ে পুছে নিয়ে যখন  বসলাম ,তখন দেখি তার দুটো তার ছেঁড়া ,অগত্যা শরীর মার্জনই হলো  সুর সাধা আর হলো না ।

 মাথা ছাড়িয়ে বেলা অনেকটা , গতর এলিয়ে বিছানায় ভাতঘুম ; এক টানা বৃষ্টির  ছপ ছপ ঝির ঝির ছন্দে উতলা হয়ে ওঠে ঘুম, তার নিস্তেজ হবার কোনও লক্ষণই যখন নেই ,তখন শব্দনেশায় মেতে ওঠে সারা শরীর , সে এখন চাইছে দেহ তত্ত্বের গান ।

সে বলে ওঠে ,ও গোঁসাই ঘুম যে আমার আসে নাকো ; বাইরের বৃষ্টি অন্তরে খরার ধারা ব'য়ে দিয়েছে যে , শুকনো কন্ঠে ভজন কি আর হয় বলো ?

শুধু তোমার জন্য ; তোমার জন্যই বৃত্তীয় পরিসীমা ধ'রে  তোমার ঘাটের আখড়ায় আসা, সেখানেই তো সকাল সন্ধ্যা সূর্যের  ছায়া ছায়া জলে উদোয়াস্ত  ফেলে দেখতে আসি গঙ্গা পাড়ের খোলা আকাশের তলটা ।

গোপনে গোপনে অভিসারে চুরমার হয়ে যাওয়া এই আমিটা তোমার ইহকালের পরকালের সুখ বৈকুণ্ঠপুরের রসযামিনী গো ,সেখানেই  তো ভাঙা গড়ার ধকল নিয়ে অভিসারিকা নিঃসারে
গোপনীয়তা বজায় রেখেছে ; তুমি না জানলে কি হবে , জানে তোমার বৈষ্ণবী আখড়াটা ।

এবার কিন্তু পাক্কা গোঁসাই সাজো , কপালে তিলক কাটো , আর এই নাও কাঁধে তোমার সাধের জোড়াতালির সখের বৈরাগীর ঝোলাটা , যেখানে মুঠি ভরে প্রথম ভিক্ষা দিলাম  আস্ত একটা মন  , সঙ্গে আছে  বৈরাগ্য সাধনার জন্য রাখা এই অভাবী শরীরটা নগর কীর্তনের কোকিলা ।

গাইতে গাইতে যখন গলা শুকিয়ে যাবে তখন দিও আকন্ঠ তৃষ্ণার স্ফটিক বারি আর শুষ্ক ঠোঁটে উষ্ণতার নরম শুশ্রূষা ।

ও গোঁসাই কোথায় গেলে  ?  তুমি এসো , নাই বা হলে কৃষ্ণ , সেই যুগের মীরা কি আর এই যুগের রাই হতে পারে গো ! সে যে সুরধুনির স্বরসুধায় রসসুধা গো !

র'সো র'সো আর রকটু পরেই না হয় যেও , নিম্নচাপ এখনো সরে নি গো গোঁসাই । নগর কীর্তনের পথ জল কাঁদায় এক্কেবারে থক থকে , হু হু বাতাসে জানালার পাল্লার দাপ দাপানি বসন্তেও যে কাঁপন ধরায়, যাওয়া যায় কেমন করে বলো দিকিনি !

 আর এই ঠাণ্ডায় গাইবোই বা কেমন করে !  তুমি বরং আগুন জ্বালো , আগুন সেঁকে সেঁকে আগুনের আলিঙ্গনে অগ্নিসিক্ত হই , তাহলে যদি তাপে তাপে কন্ঠে সুর আসে !

বৃষ্টি থামলেই বেরিয়ে পড়বে সোওওজা পথে খড়ম জোড়া হাতে  ক'রে ,নয়তো জল কাঁদায় গেঁথে গেলে পথ যে তোমার ক্লান্ত হবে গো গোঁসাই ,,,,

Post a Comment

4 Comments

  1. মন ভিক্ষা দিলাম গোঁসাই
    অসামান্য কলম
    একরাশ মুগ্ধতা

    ReplyDelete