সোমনাথ ঘোষাল



সম্মন্ধ
সোমনাথ ঘোষাল


চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে চা সিগারেট খাচ্ছি। হটাৎ দাদা একটু আগুনটা দেবেন? কথাটা কানে আসতেই আমি চকিতে ঘুরে দেখি আমার হাঁটুর বয়সী একটি মেয়ে, বয়স কত হবে এই ষোল সতেরো খুব জোর !!! এই বয়সে মেয়েরা যেমন হয় ও তাদের থেকে অনেকটাই উল্টো, সেটা ওকে দেখলেই যে কেউ বলবে। তাই আমি কোনো প্রশ্ন না করেই আমার পকেট থেকে গ্যাস লাইটার বের করে ওর দিকে বাড়িয়ে দিই। ও সেটা নিয়ে কোনো তোয়াক্কা না করে হাতের তালু থেকে বড় একটা সিগারেট বের করে ঠোঁটের ফাঁকে গুঁজে লাইটার দিয়ে তা ধরিয়ে একটা লম্বা সুখটান দিয়ে মুখ নাক দিয়ে ধোঁয়া বার করে লাইটারটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো, থ্যাংকস।
আমি চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে বললাম, ওয়েলকাম।

সেই শুরু, তারপর থেকে প্রায় সময় ওর সাথে আমার দেখা হতো, আমি লাইটার এগিয়ে দিতাম ও সিগারেট ধরিয়ে থ্যাংকস বলে চলে যেত। মাঝে মাঝে ও আমাকে সিগারেট অফার করতো, তখন আমি না নেবার জন্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন করতাম। এই টুকু, এ ছাড়া কোনো কথা হতো না।

সেদিন ছুটির এক সকাল, আমি ঘুম থেকে দেরিতে উঠেছি। অন্যান্য দিনের চেয়ে ছুটির দিনগুলোতে বরাবরই আমি দেরি করে ঘুম থেকে উঠি। তাই তাড়াতাড়ি ব্রাশ করে চায়ের দোকানের দিকে হাঁটা দিলাম।
চায়ের দোকানে এসে দেখি মেয়েটি চা সিগারেট নিয়ে হেডফোনে কার সঙ্গে কথা বলছে, আমার সঙ্গে চোখাচোখি হতে মিষ্টি হেসে আস্তে করে বললো, গুডমর্নিং।
আমিও মুচকি হেসে বললাম, গুডমর্নিং।
ও ফোনে কথা বলতে ব্যস্ত হলো, আর আমি ও সিগারেটে সুখ টান দিয়ে গরম চা-য়ে চুমুক দিতে লাগলাম।

কিছুক্ষন পরে ওর কথা বলা শেষ হলে ও আর একটা সিগারেট ধরিয়ে আমার দিকে একটা সিগারেট বাড়িয়ে দিলো। আমি হেসে বললাম, এই তো খেলাম, ও মুচকি হেসে ইশারায় নিতে বললো। আমি এবার আর না করতে পারলাম না, সিগারেট-টা ঠোঁটে লাগিয়ে সবে মাত্র ধরিয়ে একটা টান দিয়েছি হটাৎ দেখি কয়েক গজ দূরে বাবা আমারই দিকে এগিয়ে আসছেন। বাবাকে দেখা মাত্রই আমি সিগারেট-টা ফেলে দিয়ে মেয়েটিকে বলি, আমার বাবা আসছেন। মেয়েটি সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে পেছন ঘুরে বাবাকে দেখে নিয়ে আমাকে বললো, তো.....
বাবা আমার কাছে এসে আমার মোবাইটা দিয়ে বললেন, মোবাইল-টা তো নিয়ে বেরোবি, কে একজন বার বার ফোন করছেন, বলছেন খুব জরুটি দরকার আছে তোর সঙ্গে....
আমি আড় চোখে দেখলাম, মেয়েটি আবার ফোনে ব্যস্ত হয়েছে কিন্তু পোক্ত নেশারুর মতো তার ঠোঁটে সিগারেট জ্বলছে।
বাবা চলে যাবার সময় মেয়েটিকে একবার আপাত মস্তক দেখে নিলেন, আবার কয়েক পা যাবার পর পেছন ফিরে আর একবার দেখলেন। আমি মনে মনে খুব বিরক্ত হলাম মেয়েটির ওপর, কিন্তু মুখে কিছু না বলে চা সিগারেটের পয়সা মিটিয়ে দোকান থেকে হাঁটা দিলাম।
ঘন্টা খানেক পরে বাড়ি ফিরতেই দেখি কালি ঘটক বসে আছে। আমাকে দেখেই মা বললো, ও তুই এসে গেছিস, যাক আজ বিকেলে আমাদের সঙ্গে তোকে যেতে হবে।
আমি বললাম, কোথায় ?
মা বললো, এই সামনে,একটা মেয়ে দেখতে যাবো। এর আগে আমরা দেখে এসেছি, আমার পছন্দ হয়েছে কিন্তু তোর বাবার কেন জানি হয় নি। আবার এখন হটাৎ কালিকে ডেকে ওদের কে খবর দিতে বললো, বিকেলে তোকে নিয়ে আর একবার মেয়েটাকে দেখে আসবো।

মেয়েকে মায়ের আগেই পছন্দ হয়েছে, আমারও হলো, বেশ ঘরোয়া আর সুন্দরী, বউ হিসাবে বেশ ভালোই হবে। বাবা মেয়ের বাড়ির লোকেদের বলে দিলেন, মেয়ে আমাদের পছন্দ, আপনারা সময় মতো আমাদের বাড়িতে আসুন,দেখুন ভালো লাগলে আমরা এসে পাকা কথা বলে যাবো।

মেয়ের বাড়ি থেকে বেড়িয়েছি, বাবা মা আর কালি ঘটক আগে আগে হাঁটছে, আমি এটাই চেয়েছিলাম, অনেক্ষন সিগারেট খাইনি, তাই মাথাটা কেমন ঝনঝন করছে। রাস্তার বাঁক ঘুরতেই শুনলাম, ও দাদা কেমন আছেন ? দেখি বাঁকের কর্নারে সেই মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে, হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। আমাকে দেখেই সিগারেটের প্যাকেটটা এগিয়ে দিয়ে বললো, নিন।
আমি কাল বিলম্ব না করে প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরিয়ে লম্বা একটা সুখটান দিতেই, মেয়েটি বললো,
কেমন দেখলেন মেয়েকে ?
হটাৎ এ প্রশ্নে আমি ওর দিকে তাকালাম।
ও দু-বার চোখ নাচিয়ে বললো, কি কেমন লাগলো ?
আমি সিগারেটের আর এক টান মেরে বললাম, হু, ভালো। আবার বললাম, চেনো নাকি ?
ও হেসে বললো, আমার দিদি মৃন্ময়ী, খুব শান্ত মেয়ে, সাত চড়ে রা নেই। সংসারের সব কাজ করতে পটু। আর আমি নুপুর, ঝম ঝম করে শুধু বেজেই চলেছি। আপনার বাবা মা এর আগে দিদিকে দেখে গেছেন। পরে আপনার বাবা কালি ঘটক-কে বলে পাঠিয়েছেন, মেয়ের সব ভালো কিন্তু বড় বেশি ঘরোয়া, আমার ছেলের ভালো লাগবে না। একটু মডার্ন চাই।
উনি আমাকে এর আগে দেখেছেন, তাই মুখটা মনে আছে। তাই আজ সকালে উনি আমাকে চায়ের দোকানে সিগারেট খেতে দেখলেন, তখন উনি উনার সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেন, আর আপনাকে দিদিকে দেখাতে নিয়ে আসেন।
নুপুর এবার চুপ করলো। আমি পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট-টা বের করে ওর দিকে এগিয়ে দিলাম।
ও বললো, না ভালো লাগছে না।
আমি দেখি ওর চোখে জল, তাই বললাম,
আরে কাঁদছো কেন?
ও আমার হাতটা ধরে বললো, দাদা আমার দিদি কিন্তু খুব সরল মেয়ে, ও আমার মতো নয়। ওকে নিজের মতো করে গড়ে নেবেন। ও আমার খুব মিষ্টি দিদি, দেখবেন ওর যেন কোনো কষ্ট না হয়।
আমি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বললাম, দূর বোকা মেয়ে তোমার দিদির কোনো কষ্ট হবে না, এবার সিগারেট-টা জ্বালাও।
ও আমার হাত থেকে সিগারেট-টা নিয়ে ধরলো, তারপর একটা লম্বা টান মেরে এক মুখ ধোঁয়া ছেড়ে হেসে বললো, থ্যাংক ইউ ।

    সমাপ্ত

Post a Comment

2 Comments

  1. মুগ্ধতা আর মুগ্ধতা
    অপূর্ব লিখেছ

    ReplyDelete
  2. অনবদ্য লেখা । একটা অদ্ভূত চ্যালেঞ্জ আছে গল্পটার মধ্যে!

    ReplyDelete