ধর্মেন্দ্র রাওয়াত
হঠাৎ বিধবা হল নীরা ।কতই বা বয়স হবে ,তিরিশ বত্রিশ ।সমাজের রুপরেখায় চলা একটি মেয়ে -নীরা লাজুক নয় বরং স্মার্ট ।তার কথা বার্তা আচার আচরণ পোষাক পরিচ্ছদ সবই ভীষণ মার্জিত ও পরিচ্ছন্ন ।অনিমেষ মারা যাবার আগে বহুবার গেছি নীরার বাড়িতে ।আমি আর অনিমেষ বাল্যবন্ধু একই ক্লাসে পড়তাম ।পাঁচ বছরের ছোট্ট ফুটফুটে মেয়ে তানিয়াকে নিয়ে তাদের স্বপ্ন ,,নীরা অনিমেষের একে অপরের প্রতি গভীর আস্থা আমাকে মুগ্ধ করতো ।আমাদের সপরিবার আমন্ত্রন থাকতো প্রায়ই ।নীরা খাওয়াতেও ভীষণ ভালোবাসতো ।আমাদের তৃপ্তিতে ওর মুখে হাসি ফুটে উঠতো ।এক আত্মীয়তা গড়ে উঠেছিল যেন ।নীরা ও মিতার মধ্যেও বন্ধুত্ব হয়েছিল গভীর ।ওরা আমাদের বন্ধুত্বেরও প্রশংসা করতো খুব ।
আমার সাহস হয়নি নীরার কাছে গিয়ে খবরটা দিতে ,মিতায় গিয়েছিল ।চুপ হয়ে গিয়েছিল নীরা ।আকাশ ভেঙে পড়েছিল যে মাথায় ।মিতার কোলে লুটিযে পড়ে নীরা ।তানিয়াকে বুকে জড়িয়ে, সেদিন আর চোখের জল ধরে রাখতে
পারিনি আমি ।
অনিমেষ চলে গেল ।মিতা প্রতিদিন যেত নীরার বাড়ি ।মিতা এসে বলতো নীরার মনোবলের কথা ,মেয়েকে নিয়ে তার স্বপ্ন ,অনিমেষের স্বপ্ন ,ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন ।নীরার জন্য আমাদের সম্মান আরো বেড়ে গেল অনেক ।
এক এক করে ভেঙে যাওয়া দিন গতি পেল ।নীরা বাড়ির বাইরে শুরু করলো জীবন ।জীবনের দৌড় ।
নীরার ব্যক্তিত্ব অনিমেষের ভালো মানুষি ব্যবহারের জন্য অনিমেষের চলে যাওয়ায পাড়ায় শোকের ছায়া ছিল অনেকদিন ।মানুষের ভাগ্য মানুষকে কোথায় নিয়ে আসে ,-সমব্যথি ছিল সবাই নীরার প্রতি ।
ধীরে ধীরে বছর পেরোয় ।আগের মত না গেলেও ছেলে স্কুলে না গেলে আমিই পড়া জানতে যেতাম প্রায়।মিতার সঙ্গে নীরার বন্ধুত্ব আগের মতই ছিল ,কিন্তু আগের মত ও আর যেতে পাড়ত না খুব ।
নীরার আসা যাওয়ার পথে আমার সঙ্গে প্রায়ই দেখা হত ।কখনো কখনো সামান্য দু চারটে কথা বা একটু হাসি ।
বুঝতে পারছিলাম বছর না ঘুরতে না ঘুরতেই আড় চোখে সবাই দেখতে শুরু করে নীরাকে ।অনেকদিনই কেউ কিছু বলার সাহস পাইনি ।সেদিন হঠাৎ আমার বন্ধু পার্থ বলল ,"বা--বা এতক্ষন কী কথা হচ্ছিল ভাই?"কিছু না বুঝতে পারার মত করেই বললাম ,"না কিছু না ,কাল রাতে তানিয়া দু তিন বার বমি করছে ।" "ও আচ্ছা তাই ,এখন ভালো আছে তো "।এই প্রথম মনে হল আমরা দুজনেই অভিনয় করছি ।পার্থ বলল "নীরা বিয়ে করছে না কেন? আজকাল তো অনেকেই দ্বিতীয় বার বিয়ে করে ।তাছাড়া ওতো দেখতেও সুন্দরী ,অ্যাটার্কটিভ , এখনতো আবার বেশ সাজে টাজেও ।বেশ ভালই লাগে ।এত বড় জীবন ,একা একা ।যদিও তুই তো আছিস মানে তুই, মিতা ।তাহলেও একটা সুন্দরী মহিলার স্বামী থাকলে অনেকে সুবিধা ।রাস্তা ঘাটে একা একা চলা ফেরা ,তাছাড়া একটা ডিসিপ্লিন ও থাকে ।এভাবেই চলতে থাকে অনেকক্ষন কথা। বুঝতে পারছি আমাদের দুজনার কথায় ভেতরে কথা আছে ,ইঙ্গিত আছে ,কিন্তু কেউ কাউকে বুঝতে দিতে চাইছিনা ।
পাড়ার সবার চোখ কি এখন নীরার দিকে ।আনাচে কানাচে শুনতে পাচ্ছি অনেক কথা ।মাপা হচ্ছে তার হাঁটা চলা, কথাবার্তা,ঠিক ঠিক আগের মত আছে কিনা ।এমনকি সেদিন তো মিতাও বলছিল
"নীরা আর আগের মত নেই ,
"কেন কি হল ,আমি বললাম ।
"বিধবাকে বিধবার মত থাকতে হয় ।তা না হলে লোকে তো পাঁচ কান করবেই ।"
"কেন ও কি কিছু করছে ? "
"না তেমন কিছু শুনিনি ,তবে হতে কতক্ষন ,লোকের মুখ তো বন্ধ করা যায় না ,এখন তো আবার নিজেকে অনেক জ্ঞানী মনে করে ।শোন না তুমি আর অত সিমপ্যাথি দেখিও না ওকে ,আমরা তো করলাম অনেক কিছুই, এখন ও নিজের রাস্তা নিজেই দেখুক ।কোথায় কে আবার নীরার সাথে তোমাকে জড়িয়ে মিথ্যে রটনা করবে ।শোনো না তুমি কাল তানিয়ার খাতাটা দিয়ে এসো "।
"তুমি যাও না ।,"
"না না আমার সময় হবে না ।" বলে মিতা নিজের কাজে লেগে যায় ।
মাথায় ঘুরতে থাকে সত্যিই কি নীরা আগের মত নেই ,আগের মত থাকার মানে কি ,আমরা সবাই কি আগের মতই আছি ,আগের মত মানে কি সব ভালো । বিছানায় শুয়ে শুয়ে সাত পাঁচ ভাবতে থাকি ,আমিই বা কেন নীরার আসা যাওয়ার পথে ঠিক ঠিক সময়ে পাড়ার মোড়ে বা চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে থাকি ।সেটা কি কাকতলীয়! পার্থ কি তবে ঠিকই ইঙ্গিত করছে । আমি কি নীরার কাছে কিছু অধিকার চাইছি ।আমি কি ভয় পাচ্ছি কিছু হারাবার । হঠাৎ মাথা ঘুরতে শুরু করে ।উঠে পড়ি ।মিতা বলে ,কি হল কিছু খুঁজছো? ছেলে বলে ,মনে হচ্ছে বাবা কিছু লুকাচ্ছে ।
সত্যিই কি আমি কিছু লুকাচ্ছি ।মিতার মুখে বিধবাকে বিধবার মত থাকতে হয় শুনে হোঁচট খেলাম। এখনো কি আমরা সবাই তাই চাই ।এখনো কি একজন মহিলার স্বামী না থাকলে সে নিরপত্তাহীনতায় ভোগে ,রাস্তায় শুধু নয় ঘরে বাইরে কি সব জায়গাতেই বিপদ । চোর ডাকাতের নয় বাঘ ভাল্লুকের নয় ,মানুষের ভয় !
তারপর দিন রবিবার ।ছুটির দিন ।তানিয়ার খাতা দিতে পৌঁছে যাই সকাল সকাল । নীরাই দরজা খোলে ।স্নান হয়ে গেছে ।কি ভীষণ সুন্দরী লাগছে ওকে ।অনিমেষ বেঁচে থাকতে নীরাকে এই চোখে দেখিনি তো কোনদিন।খাতা দিয়েই দরজা থেকেই ফিরে আসতে চাই ।কিন্তু নীরা একরকম জোর করেই নিয়ে যায় ঘরের ভেতরে ।"অনেক দিন আসেন না দাদা ,মিতাও তো অনেক দিন আসেনি ।" চা খাইয়েই ছাড়বে নীরা ।নীরা সালোয়ার কমিজ পড়েছে ।অনিমেষ যখন বেঁচে ছিল বহু বলা সত্যেও শাড়ি ছাড়া অন্য কিছু পড়েনি ।বেশ ভালো দেখাচ্ছে নীরাকে । পিঙ্ক কালারের লিপস্টিক লাগিয়েছে নীরা ।মিতা কয়েকদিন আগেই তো বলছিল- দেখছো ,নীরা কত রকম কালারের লিপস্টিক ব্যবহার করে আজকাল ।নিশ্চয়ই কোথাও কিছু করছে ।চা নিয়ে আসে ও ।চা টা নিতে গিয়ে মনে হয় আঙুলটা ছূঁই ।পারিনা ।পাগল হচ্ছি ভেতর ভেতর ।নীরা কিছুই জানতে পারে না ।
চা খেয়েই আমি উঠে পড়ি ।
"পরের রবিবারে কিন্তু মিতা আর সুমিতকে নিয়ে অবশ্যই আসবেন দাদা, নিমন্ত্রন রইল ।দুপুরে এখানেই খাওয়া দাওয়া ।কত দিন এক সাথে খাইনি আমরা ।"
______--


4 Comments
অসামান্য লেখা
ReplyDeleteদারুণ
ReplyDeleteখুব ভাল লাগল গল্পটা ।
ReplyDeleteমনে দাগ কেটে গেলো। নববর্ষের শুভেচছা রইলো একরাশ।
ReplyDelete