অভাব
বিদিশা মুখার্জী
'মা,একটু প্যাঁজ দে কেনে?আমানি পান্ত তে প্যাঁজ ,লুন ,নঙ্কা ছাড়া কেমনে খাই বল্ দিকিন।তু আগে তো বাবুদের ঠেঁয়ে লিয়ে আইতিস।"
"মানকে রে,আগের মত আর দিন লাই ,বাফ্।এখন থেকে শুধু লুন আর ত্যাল -নঙ্কা দিন খওয়া প্যাটকিস কর্।সিদিন বৌদি র ঠেঁয়ে একখান প্যাঁজ চেয়েছিলম তা কত কথায় শুনাইলে।আমার নাকিন বড়লুকি চাল হল্ছে।এ্যই দুদিন আগেও তো কত প্যাঁজ বৌদি দিলছে।আনখাই এখন কথা শুনায়।"
"তু তো বুলছিস ,এই ঠান্ডার দিনে ঠাণ্ডা ভাতকটা গলাকে এটকে যেছে,দুদিন ধরে খানিক তরকারি ও আনছিস না তু।প্যাঁজ হলে তবু খানিক খেতে পারি,এখন যে একবারেই লাড়ছি, মা ।ধানকাটার সময় না খেইতে পেলে গা হাত পা হালে যি।"
"জানি বাফ্ আমার।একটু কষ্ট কর্ কেনে।আমি বৌদির ঠেঁয়ে আজ তরকারি চেয়ে এনে দুবো।"
(2)
"অ বৌদি,একঠো কথা বুলব?"
"বলো"
"বলছি একটু তরকারি দেবে?"
খুব অসন্তুষ্ট মুখে বৌদি তাকালো কাজের মেয়ে ময়নার দিকে।তারপর বললো,
"আজ তরকারি দিচ্ছি ,ময়না।তবে আর চেও না।এখন সব্জির বাজার আগুন, আমরা মধ্যবিত্ত মানুষ,বাজার করছি কষ্ট করে ,আগের মত তরকারি দেওয়ার মত আর ক্ষমতা নাই।"
"সি কি গো,তুমি তো আগে কত তরকারি আমাকে ডেকে দিতে বৌদি,আমার মান্কে
তুমার রান্না খেঁয়ে কি সুখ্যাত করত।"
বৌদি খানিক নরম হয়ে
"সেদিন কাল আর কি আসবে গো।পিঁয়াজ তো আকাশ ছোঁয়া দাম।আর ভালো রান্না বলছো?আজকাল এত কম পেঁয়াজ দিয়ে রাঁধতে হচ্ছে যে তেমন ভালো কোনো খাবার বানাতেই পারছি না।পেঁয়াজ রসুন দিয়ে না কষলে কি আর সে স্বাদ হয় গো।"
"তা ঠি কোই বলেছো বৌদি।আগে হাট থিকে ফেরবার সময় মানকের বাপ পচা প্যাঁজ আনতো,সেগুলানের উপরের ছাল ছিলে আমি রান্না তে দিথ্ম,এখন আর আনছেই না।সিদিন বললম তো আমাকে বুললে আর নাকি প্যাঁজ বিকিয়েরা পচা প্যাঁজ ফেলছেই না।ওরাও উপরের চাম তুলে যা বেড়িন আসছে তাই কম দরে বিকিয়ে দিছে।"
"তাহলেই বোঝো।তোমরা তো তাও খালবিল থেকে ছোটোমাছ ধরে গেঁড়ি গুগলি ধরে খেতে পারবে।আমরা মধ্যবিত্ত রা, না তো খাওয়া ছাড়তে পারি,না এত দাম দিতে পারি।তবু কিনতে হচ্ছে ,না খেয়ে তো আর থাকতে পারি না।তবে আগের মত আর গাদা তরকারী বানাতে পারছি না যে তোমাকে দেবো।"
কাজের মেয়ে ও বৌদি দুজনের ই ম্লান হাসি মুখে।
(৩)
ময়না ও মানকে র কথা
"মা,দ্যাখ কেনে আজকে কত গুগলি পেইছি।তু ভালো করে রেঁধে দে ।রেতে ভাতের সঙ্গে খাবো।"
"কি করে ভালো করে রাঁধবো, বাফ্?প্যাঁজ, লসুন কুথাকে পাবো।প্যাঁজ ,লসুন ,আলু কুনোটাই ঘরকে লাই"।
"তু উয়াদের ঠেঁঙে মেগে লিয়ে আয় কেনে।"
"কাদের ঠেঁঙে?"
"কেনে তুয়ার বাবুদের ঠেঁঙে।লক্ষ্মী মা ,বুন্টি আমার ,আজ খানিক ভালা খেতে মুন্ যেছে।"
মানকে র মুখ দেখে ময়না চুপ করে যায়।ছেলেকে বলতে মন চায় না যে বৌদিও তার দরাজ হাত ছোটো করে নিয়েছে।তবে ছেলেকে দেখে মায়া হয় ,তাই মরিয়া হয়ে ভাবে একবার বৌদির কাছে হাত পাতবে।
(4)
"অ বৌদি,একখান প্যাঁজ আর দুকোয়া লসুন দাও কেনে।মানকে গুগলি এনেছে
রেতে খানিক তরকারী করথ্ম"
সাহস করে আর আলু চাইতে পারেনা।হাটের উপর দিয়ে ঘর ফেরার সময় ঠিক জোগাড় হবে আলু,আদা নয় নাই বা দিল।
"বলো কি ময়না, পেঁয়াজ কোথায় পাবো।না ময়না দু কোয়া রসুন নিয়ে যাও,পেঁয়াজ চেও না ।আর এখন থেকে হুটহাট চেওনা কিছু।"
বৌদির প্রস্থান।ময়নার স্বগোতোক্তি
"বৌদির আনাজের টুকরিতে অত বড় চারটে প্যাঁজ, তবু দিলে না কো।আমি লিজেই একটো লিয়ে লি।প্যাঁজ চুরি লিচ্চয় চুরি লয়।"
হঠাৎ বৌদি চলে আসে।
"ময়না, কোঁচড়ে কি তোমার?তখন তো কিছু ছিল না।"
"কই কিছু না তো।"
"মিথ্যে বলো না।"
"সত্যি করে বলো কি লুকিয়েছো?"
"সত্যি বুলছি বৌদি কিছু লাইকো"
"দেখো ময়না,নিজে থেকে বলো ,নইলে কিন্তু আমি তোমার কোঁচড় খুলে দেখবো।"
ময়না থরোথরো হাতে তার কোঁচড় খুলে দেখায়,বেরিয়ে আসে একটা বড় পেঁয়াজ।
"ছিই ময়না, তুমি চুরি করলে?আজ পাঁচ বছর তুমি কাজ করছো,কোনোদিন একটা টাকাও তোমাকে সরাতে দেখিনি।আজ তুমি পিঁয়াজ চুরি করলে ? এত লোভী তুমি"?
"বৌদি বিশ্বেস করো আজ পনেরো দিন ছেলেটা শুধু জলভাত খেছে,কুছুই দিথে পারিনি, আজ খানিক গুগলি খেতে চেয়েছিলো তাই একটো প্যাঁজ চেয়েছিলম তুমাকে।তুমি দিলেক লাই।তাই লিয়েছিলোম বৌদি।"
"তুমি আগে যখন চাইতে কোনোদিন কি না করেছি?আজ যখন দিতে পারছি না তখন তো বুঝতে হবে অবস্থা।তুমি শুধু তোমার টা দেখলে?"
"বৌদি,একটা প্যাঁজ এর লেগে এত কথা শোনাচ্ছো?তোমরা বড়লুক ,চাইলে কিনতে পারো,আমরা তো তা পারি না বৌদি,তাই চেয়েমেগে খাই।"
"না ,এখন আর চাইলেই কিনতে পারিনা,দেশে আকাল পড়লে তোমার আমার সমান অবস্থা।যায় হোক তোমাকে বলে লাভ নাই।যে পেঁয়াজ টা নিয়েছো নিয়ে চলে যাও।আর কোনোদিন এরকম চুরি ও করবে না চাইবেও না।যাওও"
অপমান মাথায় নিয়ে ছলোছলো চোখে ময়না চলে যায়।


2 Comments
অসামান্য একরাশ মুগ্ধতা
ReplyDeleteখুব সুন্দর
ReplyDelete