হিমঝুরি
অলিপা পাল
দুটো টিলার মাঝে চলে গেছে পায়ে হাঁটা পথ ৷বছরের শেষে হঠাৎ কয়েক দিনের নিম্নচপের বৃষ্টির জলে রাস্তার দুধারের গাছ গুলো আরো সবুজ হয়ে উঠেছে ৷বিশুদ্ধ বাতাস আর তরঙ্গের মত টিলার সারি ৷সবুজে মাখা গাছ গাছলি ঘেরা গ্রাম ৷ প্রকৃতির বুকে ছোট কুঁড়েতে হেসে খেলে দিন কাটায় গ্রামের মানুষ গুলো৷প্রকৃতি প্রেমিক আদিবাসী'রা সংস্কৃতি প্রিয় ৷সুন্দর শিল্প কলা ফুটে ওঠে গ্রামে ৷ এক সময় শাল পিয়ালের ঘন জঙ্গল ভেদ করে সূর্যের আলোও ভালো ভাবে ঢুকতে পারতো না ৷বন্য জীব জন্তুরা ঘুরে বেড়াতো,দিনের বেলাতেও কেউ জঙ্গলের আশে পাশে আসতো না ৷ দুদিন ধরে শীত'কে উপেক্ষা করে প্রত্যন্ত এই আদিবাসী গ্রামে লোক- সংস্কৃতির বর্ষবরণ উৎসব "খেরওয়ালতুকৌ "শুরু হয়েছে ৷
মেলায় তুলে ধরা হয়েছে আদিবাসী সংস্কৃতি ও জীবন যাত্রার ইতিহাস, মহিলা-পুরুষ আদিবাসী দলের বাহা ও দাঁশাই নৃত্য প্রতিযোগীতা ৷
হঠাৎ ভিতর থেকে অর্নব চিৎকার করে ওঠে-রান্না কি বসবে না? অফিস আছে তো !বারান্দায় বসে থাকলে কি চলবে?ঘোর কাটে সৌমির,ফিরে আসে ভাবনার জগৎ থেকে৷বৃষ্টির সোঁদা গন্ধ চোখ বুজিয়ে দীর্ঘশ্বাসের সাথে প্রানভারে নিয়ে রান্না ঘরে ঢুকলো ৷শহরের কংক্রিটের জঙ্গল থেকে বহুদূরে আদিম প্রকৃতি নেশার মত গ্রাস করছে সৌমিকে ৷অর্ণবের সেচ দপ্তরের চাকরীর সূত্রে এখান কার কোয়াটারে এসে ওঠা,এক মাসেই
সৌমি ভালোবেসে ফেলেছে এই আদিবাসী গ্রামকে ৷
পাশাপাশি সারি দেওয়া বাংলো প্যাটার্নের কোয়ার্টার৷দুটো বড় ঘর রান্না ঘর বাথ রুম সামনে একফালি বারান্দা,তার সামনে ছোটো ফুল ফল সব্জির বাগান ৷সকাল দশটা থেকে সন্ধ্যা সাতটা অর্ণবের অফিস ৷নিজে হাতেই পরিচর্যা করে সৌমি,তার অসহনীয় একাকীত্ব কাটানোর বড় সঙ্গী এই বাগান ৷শাল মহুয়া গাছ প্রাচীরের মত ঘিরে আছে বাংলোকে৷ গেটের দুদিকে বাগান আর বা দিকে আছে কর্ক গাছ,রবীন্দ্রনাথের
হিমঝুরি ৷এক সময় এর মোটা বাকল দিয়ে ছিপি তৈরী হতো ৷এই গাছ বেশ উঁচু ডল পালায় নোয়ানো, আগা সরু যৌগ পত্র,সাদা ফুল কার্পেটের মতো বিছিয়ে থাকে,ফুলের মধুর গন্ধ,রাতে ফুটে ভোরের আগেই ঝরে পড়ে,নলের মত সাদা ফুল!সৌমি সুক্ষ দৃষ্টিতে লক্ষ্য করে ফুলের কুঁড়ি আসা থেকে ঝরে পড়া,ঝরা ফুল কুড়িয়ে মুখে ছোঁয়ায়,তাদের ঝরে যাওয়ার যেনো কান্না শুনতে পায় ৷
সৌমি কোন দিন এমন জীবন চায়নি৷ অর্ণবের কাছে স্ত্রী'র অর্থ ঘরের কাজে পারদর্শী আর বিছানায় সুখ দেওয়ার যন্ত্র ৷জীবনে মনের মত মানুষ খুঁজে পেলোনা যে তার মনের কথা বুঝবে,ও চেয়ে ছিলো স্বনির্ভর হয়ে পৃথিবী ঘুরে দেখবে,প্রকৃতির রুপ রস গন্ধ মাখবে৷ হয়তো মেয়েদের সে অধিকার নেই! ইচ্ছা ছিলোনা বিবাহিত জীবনে আসার,তবে এই গ্রামে এসে সৌমি বাঁচার স্বাদ খুঁজে পেয়েছে ৷একটু দূরে বয়ে যাওয়া কাঞ্চি নদীর কলকল শব্দ চুম্বকের মতো আকর্ষন করে সৌমিকে, অর্ণবকে কতবার বলেছে নিয়ে যাওয়ার জন্য ,কিন্তু অর্ণবের কাছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য অনুভূতি হীন,ওর ভাবনায় শুধু সীমাবদ্ধ প্রকৃতি মানে উইকেন্ডে পিকনিক মদ ফূর্তি ৷
সৌমির হাতে হাতে কাজ করে দেয় বারো তেরো বছরের আদিবাসী মেয়ে রঞ্জাবতী হেমব্রম , সারদিন সৌমির সাথে থেকে দুপুরের পর ভাত খেয়ে বাড়ী যায় ৷সৌমি ওর জন্য বই খাতা এনেছে,অবসর সময় পড়ায়,ওর থেকে জেনে সৌমি একাই একদিন চলেগেলো আকাঙ্খিত কাঞ্চি নদী উপভোগ করতে ৷
অনেক গুলো পাথুরে সিঁড়ি নেমে গেছে ৷সামনে বিস্ময়কর দশম জলপ্রপাত !সুবর্ণ রেখা নদীর উপনদী কাঞ্চি ধাপে ধাপে পড়ে সুদৃশ্য জলপ্রপাত তৈরী হয়েছে ৷স্বচ্ছ জলে গাছের ছায়া পড়ে জলের নিচে ফুটে উঠেছে আরেক বনের প্রতিচ্ছবি ৷ সৌমির নীরবতা ভাঙায় এগাছ থেকে ওগাছে লাফিয়ে পড়া কাঠবিড়ালি আর জলের মাঝে ডুবো খেলায় ব্যস্ত পানকৌড়ি ৷ হঠাৎ পাশে তাকিয়ে দেখে ওরই মতো আরেকটা পাথরের উপর বসে আছে এক ভদ্রলোক ৷ একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে জলের দিকে, যেন প্রকৃতির সব রুপ সে একাই টেনে নেবে ৷
সৌমি নিজের পরিচয় দিয়ে আলাপ করলো ভদ্র লোকটির সাথে ৷ব্যক্তিটি নমস্কার করে বললো আমি সুমন্ত্র চ্যাটার্জী,এখানকার বনদপ্তরের কর্মী৷ বাড়ী জলপাইগুড়ি,বাবা মা স্ত্রী পরিবার বলতে কিছু নেই ৷প্রকৃতিকে ভালবেসে এখানেই থেকে গেছি ৷
নদীর দুপাশ জুড়ে বিস্তীর্ণ খয়রি টিলা আর তার উপর খেলা করে বেড়ায় নানান রংবাহারি পাখির দল, ওরা আপন খেয়ালে ডানা মেলে নীল আকাশে ৷ কখনোবা জলের ওপরে উড়তে-উড়তে ঠোঁটে ঠোঁট দিয়ে মেতে ওঠে খুনসুটিতে ৷আর চেনা অচেনা অসংখ্য গাছ ৷ভেসে আসে মহুয়ার মাদকতা ৷বুনো গন্ধে প্রকৃতি মুখর ৷ নদীর চর ঘেঁষে গাছ কিছুটা গভীর ৷
কানে ভেসে আসে পাখি আর কিছু বুনো পশুর ডাক ৷
কেমন লাগছে?
নীরবতা ভেঙে,সুমন্ত্রর কথায় অচ্ছনতা কাটে সৌমির ৷সৌমি বলে কোন ভাষা নেই এই সৌন্দর্যের রুপ বর্ননার ৷ সুমন্ত্র মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় বলে প্রতিদিন আসি তবু মনে হয় নতুন আসছি ৷ভিন্ন সময়ে ভিন্ন রুপ নদীর প্রকৃতির ৷ওরা দুজনে নদীর জলে পা ডুবিয়ে জলের মধ্যের উঁচু ঢিবিতে বসলো ৷নদীর হাওয়ায় সৌমির মুখে পড়ছে এলোচুল, টিলার পিছনে অস্তগামী রোদ মুখে পড়ে অপরুপা হয়ে উঠেছে সৌমি,সে সুরেলা কন্ঠে মৃদুস্বরে গেয়ে ওঠে "দাঁড়িয়ে আছো তুমি আমার গানের ও পারে ৷"শুনে সুমন্ত্র বলে আপনার স্বামী ব্যক্তিটি কিন্তু খুব ভাগ্যবান ৷ যখন খুশী এত মিষ্টি কন্ঠের গান শুনতে পায় ৷ সৌমির মুখ নিমেষের মধ্যে থমথমে হয়ে ওঠে ৷বিড়বিড়িয়ে বলে আমি গান গাই অর্ণব যানতেই চায়নি কোনদিন৷ এই সম্পর্ক আমার কাছে বোঝাপড়া ৷ টিকিয়ে রাখা কর্তব্য ৷আমি অনাথ,অর্ণবের মামা বাড়ীতেই বড় হয়েছি, সেই দায় বদ্ধতা, আমার ভালোলাগা আর অর্ণবের ভালোলাগা সম্পূর্ণ আলাদা ৷সুমন্ত্র কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করে কি কি ভালোলাগে আপনার !এই প্রথম সৌমিকে কেউ ওর মনের কথা জানতে চাইলো !চঞ্চল হয়ে বাচ্চাদের মতো বলে ওঠে সৌমি, অনেক কিছু !হাতির পিঠে চড়ে জঙ্গল ঘুরবো, বরফে স্লেজ করে ঘুরবো,গাছের মাথায় ঘরে থাকবো, ইয়াক চড়বো,নিশীথ সূর্যের দেশে ছয় মাস করে দিন রাত উপভোগ করবো,উটের পিঠে করে বালির ঝড় গায়ে মাখবো, বাইক চালিয়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়াবো সৌমি গড়গড়িয়ে বলে যায় হঠাৎ দেখে সুমন্ত্র হাসছে!লজ্জায় মুখ লাল হয়ে যায় সৌমির,বলে আপনি জিগ্গেস করলেন তাই বললাম !সকলের মতো আপনিও পাগল ভাবছেন!সুমন্ত্র হাসতে হাসতে বলে আরে আমি তো হাসলাম এই ভেবে যে অামার মনের কথা আপনি জানলেন কি করে? অামার ভবঘুরে বাউন্ডুলে জীবনে কোন দিন কেউ আমার মনের কথা বোঝেনি,সৌমি এতক্ষনে সচ্ছন্দ বোধ করে,দুজনের হাসিতে ভরে ওঠে সূর্য ডোবা প্রকৃতির কাঞ্চি নদী৷
এই ভাবে কেটে যায় বেশ কয়েক মাস৷ ওদের বন্ধুত্ব গাঢ় হয়৷ সাক্ষী থাকে কাঞ্চি নদী ৷সৌমি সারাক্ষন আনন্দে হাসি খুশীতে থাকে এই ভেবে ওর মন পূর্ণতা পেয়েছে ৷ সারদিন অপেক্ষা করে থাকে দুপুরের পর নদীর তীরে সুমন্ত্রর সাথে কাটাবে,দুজনে প্রকৃতিকে নতুন রুপে দেখবে ৷সুমন্ত্রর নদীতীরে আসতে দেরি হলে সৌমি অভিমান করে সুমন্ত্র তার মান ভাঙায়৷
এই ভাবে তাদের বন্ধুত্ব নিবিড় হয় ৷ প্রকৃতির রঙ মেখে ভেসে বেড়ায় মেঘের মত ৷ সৌমির জীবনের সম্পূর্ণ অস্তিত্ব জুড়ে এখন সুমন্ত্র ৷
আজকাল অর্ণবের সাথে কথা হয়না বললেই চলে ৷ অনেক বার বলতে চেয়েছে সৌমি ৷কাঞ্চি নদীর মুগ্ধতা,সুমন্ত্রর বন্ধুত্ব,এসব বিষয়ে কোন আগ্রহ নেই ব্যস্ত অর্ণবের ৷ সৌমি যে তার সাথে এক বাড়িতে থাকে তাই যেন মনে নেই অর্ণবের ৷ এখন আর এক বিছানায় শুতেও ইচ্ছা করেনা সৌমির ৷চলে যেতে চায় কোন নাম না জানা দ্বীপে,যেখানে থাকবে অপূর্ব প্রকৃতির হাতছানি আর প্রকৃতি প্রেমিক সুমন্ত্রর বন্ধুত্ব ৷মনে হয় নদীর পাড়ে বসে চিৎকার করে বলে "ধন্যবাদ সুমন্ত্র আমাকে সম্পূর্ণ করার জন্য,নিজেকে খুঁজে পাওয়ার জন্য"৷ সেই আওয়াজ নদী থেকে টিলায় টিলায় প্রতিধ্বনী হবে ৷
এক সপ্তাহ পেড়িয়ে গেছে সুমন্ত্র নদীর পাড়ে আসছে না ৷প্রতিদিন অপেক্ষা করে ক্লান্ত হয়ে ফিরে আসে সৌমি,মন ভালো লাগছে না, ওর মনে হচ্ছে যদি চিৎকার করে কানতে পড়তো! হয়তো বুকটা একটু হাল্কা হতো ৷ এই কয়েক মাসেই সুমন্ত্র সৌমির জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে,ওর অনুপস্থিতি প্রতি মুহুর্তে অনুভব করতে পারছে সৌমি ৷
রাত যত গভীর হচ্ছে নিস্তব্ধতা ভাঙার চেষ্টা করছে ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক ৷ সৌমির ঘুম আসছে না,চোখের জল বাঁধ মানছে না ৷বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করছে নিশ্বাস যেনো বন্ধ হয়ে আসছে ,পাশে অর্ণবের নাক ডাকার শব্দ অসহ্য লাগছে ৷ দুর থেকে ভেসে আসছে কোন পাখির কু-কু ডাক ,এই ডাক সৌমির খুব চেনা শুনলে মন বিষাদে ভরে ওঠে ৷একটা পেঁচা রোজই জানলার পাশে নুয়ে পড়া পলাশ গাছের ডালে বসে, আজ তার ডাক বড্ড গুরু গম্ভীর লাগছে,কিছু দিন আগেও রাতের এই পরিবেশকে উপভোগ করতে ভালো লাগতো সৌমির ৷বদ্ধ ঘরে সৌমি আর থাকতে পারলো না,দরজা খুলে বাইরে গিয়ে বসলো ৷ শীতের আকাশ তারায় ঝলমল করছে ৷সৌমি ব্যস্ত হয়ে পড়লো শিকারী কালপুরুষকে আকাশে খুঁজতে ৷হিমঝুরি গাছ থেকে টুপটাপ করে ফুল ঝরতে শুরু করেছে, এত স্নিগ্ধ পরিবেশেও সুমন্ত্র ওর পাশে নেই ৷সুমন্ত্র কি করে পারছো এত কষ্ট দিতে!এমন তো হওয়ার কথা ছিলো না,ক্লান্ত সৌমি বসে পড়ে হিমঝুরি গাছে হেলান দিয়ে,হঠাৎ দেখতে পায় সুমন্ত্রকে, নদীর দিকে যাওয়ার পথ ধরে হেটে যাচ্ছে ৷এত রাতে সুমন্ত্র!কোথায় যাচ্ছে?এক মুহুর্ত দেরি না করে ওর পিছু নেয় সৌমি, কিছুতেই দৌড়ে ধরতে পারছে না সুমন্ত্রকে সুমন্ত্র যেনো হাওয়ার ওপরে পা ফেলছে ৷অন্ধকার রাতের কাঁকুড়ে পথে পাথরে হোঁচট খেয়ে পড়ে যায় সৌমি ৷
নদীর ধারে পাথরে বসে আছে সুমন্ত্র ও সৌমি ৷চোখের জল আর অভিমান মিশিয়ে সৌমি জানতে চায় এত দিন এখানে কেনো অসেনি?সুমন্ত্র'র হাত ছুঁতে যেতেই সে সরে বসে, বলে তুমি বিবাহিত,মন দিয়ে সংসার করো ৷ সুমন্ত্র'র অপ্রত্যাশিত কথায় চমকে ওঠার থেকেও অবাক হয় বেশী সৌমি,বলে কিসের বিয়ে! ক'টা মন্ত্র উচ্চারণ করলেই বিয়ে হয় না,বিয়েতে মনের মিল থাকাও জরুরী, আর মনের যোগাযোগ না থাকলে ভালোবাসা গড়ে ওঠে না ৷অমি এত দিন মরে বেঁচে ছিলাম,সুমন্ত্র! তুমি আসার পর প্রাণ ফিরে পেয়েছি, তোমাকে কখন ভালোবেসে ফেলেছি নিজেও জানিনা ৷এক নিশ্বাসে বলে যায় সৌমি ৷সুমন্ত্র দায়সারা ভাবে বলে এসব মাথাতেও এনো না,তোমার সাথে দেখা হওয়া কাকতালীয়,কথা বলে বুঝেছি তুমি খুব একা,তোমার একজন বন্ধু প্রয়োজন,কিন্তু যে দিন বুঝেছি আমার প্রতি দূর্বল হয়ে পড়েছ সেদিন থেকেই নিজেকে সরিয়ে নিয়েছি,চাইনি কোনদিন তোমার সামনে আসতে ৷ বুঝিনি যে তুমি এভাবে ভেঙে পড়তে পারো, তাই আর পারলাম না নিজের সিদ্ধান্তে অবিচল থাকতে ৷ সুমন্ত্রকে প্রায় থামিয়ে দিয়েই সৌমি বলে উঠলো বিবাহিত তাই! তাই আমি তোমার অনুপযুক্ত? সুমন্ত্র অসহায়ের মত বললো তুমি বুঝতে পারছোনা,সব সত্য জানোনা তাই ছেলেমানুষি করছো ৷সম্পর্ক সবার সাথে হয় না ৷ সৌমি এবার ঝাঁঝিয়ে ওঠে,কি সত্য জানি না!সুমন্ত্র কিছুক্ষন চুপ করে থেকে বলে সম্পর্ক মানুষে- মানুষে হয়,আত্মা মানুষে নয়!সৌমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে সুমন্ত্রর দিকে !কি বলছে! ঠিক শুনছি! সৌমি নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারেনা ৷সুমন্ত্র অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বলে ঠিক শুনেছ,আমার, তোমার মত প্রান নেই ৷ এটা শরীর না অবয়ব, আমি মৃত সৌমি ! আমি মৃত ৷সৌমি! আট মাস আগে আমি তোমার মত মানুষ ছিলাম,জঙ্গলে চাকরী!আর প্রকৃতিকে ভালোবাসার দরুন বিষাক্ত কীটের দংশনে তিন দিনের জ্বরে মারা গেলাম, এই সহজ সরল প্রকৃতিকে ভালোবেসে এই হাওয়াতেই ভেসে বেড়াচ্ছি ৷গম্ভীর গলায় সুমন্ত্র বলে আজকের পর আর দেখা হবে না৷তোমার সরল মনে জটিলতা এনোনা ৷ আমাকে ছাড়াই প্রকৃতিকে ভালোবাসো ৷
সৌমি অবাক হয়ে শুনছিলো সব কথা,কিছুটা ধাতস্থ হয়ে বলে, সত্যি করে বলবে! সুমন্ত্র ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানায়,সৌমি ওর চোখে চোখ রেখে জিগ্গেস করে শুধু আমাকে ভালো রাখার জন্যে আসতে? আমাদের এক সাথে কাটানো দিন গুলো তোমার ভালো লাগেনি?আমার প্রতি দূর্বল হওনি?ভালো বাসোনি?
সুমন্ত্র বসে পড়ে টিলার উপর বলে খুব খুব ভালবাসি তোমায় সৌমি ৷
কিন্তু মানুষ আর আত্মার ভালোবাসা হয় না ৷খুব ধীরে ধীরে অস্ফুটে বলে সৌমি মৃতের সাথে মৃতের তো মিলন হয়! সৌমি হেঁটে যায় নদীর পার ধরে ফলসের দিকে ৷ অবাক হয়ে বসে থেকে সৌমির চলে যাওয়া দেখে
সুমন্ত্র ৷
কলিংবেল অনবরত বেজে চলেছে ৷ একটু থামছে অাবার বাজে, কানের উপর বালিশ দিয়ে চেপে রেখে বিরক্ত হয়ে অর্ণব ভাবে একটা ছুটির দিন শান্তিতে ঘুমাতে দেবে না!সৌমি কি পারছে না দরজা খুলতে! কাজের মেয়েটা কি যেন নাম সেও তো আছে৷ অর্ণব অরো বিরক্ত ওর মা ও মামার উপর,জোর করে গলায় ঝুলিয়ে দিলো একটা অনাথ মেয়ে যার বাবা মা ধর্ম কোন পরিচয় নেই,তার ওপর আবার অসামাজিক,কলিগরা পর্যন্ত বিদ্রুপ করে হাসে ৷কোনো অফিসিয়াল পার্টিতে নিয়ে যাওয়া যায় না, করোর সাথে ভালো করে কথা পর্যন্ত বলে না,কিছু দিন আগে জুনিয়ার সহকর্মী পর্যন্ত বললো 'অর্ণব'দার স্ত্রী ফুলের কান্না শুনতে পায়'!না আর না এবার কলকাতায় ফিরে সাইক্রিয়াটিস্ট ডঃ মল্লিককের চেম্বারে সৌমিকে দেখাতেই হবে, পাগলামোর সীমা অতিক্রম করেছে ৷
বেল এক ভাবে বেজে চলেছে ৷বিরক্ত অর্ণব বালিশ ছুঁড়ে দিলো বাছানার অন্য পাশে,অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করে চিৎকার করে সৌমিকে ডাকলো,কিন্তু কোন উত্তর এলো না,রান্না ঘর থেকেও কোন শব্দ আসছে না ৷বাধ্য হয়ে অর্ণব বিছানা থেকে উঠে গেলো দরজা খুলতে,দরজা তো ভেজানো,তবে বেল বাজাচ্ছে কে! অর্ণব দেখে হতভম্ব হয়ে গেলো, সামনে কাজের মেয়ে ও কিছু গ্রামের লোক, তাদের সবার মুখে উদ্বিগ্নের ছাপ, তখনি গেটে এসে দাঁড়ালো পুলিশের গাড়ী ৷অর্ণব নেমে এলো বারান্দা থেকে ৷এক জন অফিসার অর্ণব'কে বললেন আপনার মিসেস কোথায়? অর্ণব অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে বললো ঘরেই আছে হয়তো!অফিসার বিরক্ত হয়ে বললো না আপনার স্ত্রী ঘরে নেই ,এবং কোন দিন'ই উনি দুপুরে ঘরে থাকতেন না, একা ঘুরে বেড়াতেন নদীর ধারে, তাছাড়া নিজের মনে একা-একা কথাও বলে যেতেন,গ্রামের লোকের মতে ওনার অঙ্গ ভঙ্গিতে প্রকাশ পেতো কারোর সাথে কথা বলছে কিন্তু কেউ ওনার সাথে থাকতো না ,সম্ভবত উনি মানসিক রোগী ছিলেন! যাইহোক সকালে ফলসের জলে পাথরের উপর ওনার বডি পাওয়া গেছে, এলাকার লোকজন থানায় জানায়,তো আপনি আমার গাড়ীতে আসুন বডি সনাক্ত করতে হবে, তার পর মর্গে যাবে, আপনাকে কিছু জিগ্গাসাবাদ আছে,সইসাবুদ অনেক ফর্মালিটিস আছে ৷
কলকাতা সেচ দপ্তরের ভার প্রাপ্ত অফিসার অর্ণব ভট্টাচার্য্য ৷সহকর্মী এখন সহধর্মিনী, তিন বছরের মেয়ে, মা সুখের সংসার ৷কেটে যাওয়া এত গুলো বছরে হয়তো সৌমির সাথে দেখা হয়েছে সুমন্ত্রর,মৃত্যুর পরে সম্পূর্ণ হয়েছে ওদের ভালোবাসা, এখনো হয়তো ওরা ঘুরে বেড়ায় নদীর পার ধরে,গোধূলীর আলো ছুঁয়ে যায় ওদের মুখে ৷


19 Comments
বাহ্.. খুব ভালো লাগলো
ReplyDeleteধন্যবাদ
Deleteভালোথেকো
বাহ্.. খুব ভালো লাগলো
ReplyDeleteধন্যবাদ
Deleteদারুণ, বাহ!
ReplyDeleteভালো থেকো দিদি
Deleteদারুণ দারুণ লিখলে । একটা মিষ্টি প্রেমের গল্প টার্ন নিল ভূতের গল্পে । কি দারুণ প্রকৃতির বর্ণনা। অপূর্ব লিখলে ।
ReplyDeleteধন্যবাদ
ReplyDeleteভালো থেকো দাদা
ভীষণ ভালো লিখেছো ❤❤
ReplyDeleteধন্যবাদ
Deleteধন্যবাদ দিদি ভালো থেকো
Deleteভীষণ ভালো লিখেছো ❤❤
ReplyDeleteভালো থেকো দিদি
Deleteঅপূর্ব সুন্দর প্রকৃতির বর্নণার সাথে বেশ ভালো লাগলো
ReplyDeleteভালো থেকো দিদি
ReplyDeleteভালো থেকো দিদি
ReplyDeleteভালো হয়েছে, তবে আগামীতে আরো ভালো লেখা দিও কিন্তু
ReplyDeleteKhub valo laglo.... Beautiful..
ReplyDeleteঅপূর্ব লেখনী
ReplyDelete