অনামিকা বোস (অনু)


গল্প—ভয়
অনামিকা বোস (অনু)


ছোটো অনু ,তখন তার বয়স পাঁচ বছর ৷ অনুর বাবা-মা ,দুই দিদি আর  একটা দুই বছরের ছোট্ট বোনের সাথে কোয়াটারে থাকতো ৷অভাবের সংসার তাদের, কিন্তু তাদের সুখের সংসারে ছিল ৷অনুর বাবা সারাদিন হারভাঙা খাটনি করে রাতে  বাড়ি ফিরতো ৷দিনের শেষে রাতের বেলায় তখন দু-মুঠো অন্য যোগার করতে গিয়ে হিমসিম খেতো ৷অনুর মা সংসারের লক্ষ্মী ছিলো ৷চুপচাপ মুখ বুজে সংসারের কাজ করে চারটে সন্তানকে মানুষ করে চলছিল ৷অনু ছোটো থেকেই খুব কল্পনার জগতে ভেসে বেড়াতো ৷অনু সব কিছুতেই খূব ভয় পেতো বিশেষ করে ভূতের ভয় ৷অনুকে সারাক্ষন ভূতের ভয় তারা করে বেড়াতো ৷একটু অন্ধকার হলেই ভয়ে বিছানায় চাঁদর দিয়ে মাথা ঢেকে লুকিয়ে থাকতো ৷রাত হলেই ভূতের ভয়ে ঘর ছেড়ে বাইরে যেতো না কখনই ৷এই ভয় দিনে দিনে বেড়ে যেতে থাকলো ৷অনুর কোয়াটারে মধ্যেই লম্বা লম্বা চারটে তাল গাছ ছিল ৷শুধু মাত্র একটি গাছেই তালের ফলন হতো ৷বাকি গাছে কোনোদিন ফলন হতো না ৷কিন্তু তাতে কি ?অনুর ধারনা ছিল সব কটি তাল গাছেই ভূত বাস করে ,তাই বাইরে গেলে ভূত গুলো অনুকে তুলে নিয়ে যাবে সেই তাল গাছের মাথায় ৷তাই সে রাতে কেন, দিনের বেলাতেও একা একা বাইরে যেতে ভয় পেত ৷ এই ভাবেই অনুর মনের ভয় নিয়েই দিন গুলো কাটছিলো ৷ বোনেদের সাথে সারাক্ষন অনুর  খেলাধূলা চলতো ৷পড়াশুনা তার কখনই ভালো লাগতো না ৷কোয়াটারের পাশে একটা বড়ো কালী মন্দির ছিল ৷সেখানেই অনুর ছোটো বেলা কেটেছে খুবই আনন্দে ৷ ছোটো বেলার সেই স্বর্গ সুখ এখনও ভুলতে পারে না অনু ৷গাছে ওঠা ,পুতুলখেলা ,পুতুলের বিয়ে দেওয়া ,পুকুরের জলে ঘন্টার পড় ঘন্টা ডুবে থাকা ,এমনকি দিদি আর বন্ধুদের সাথে গামছা দিয়ে মাছ ধরা পর্যন্ত খুব মজা করছে ছোটোবেলায় ৷ দিনের শেষে অনুর মা যখন বই নিয়ে  পড়াশোনা করার কথা বলতো  তখন অনুর চোখে খুব ঘুম পেতো ৷কিছুতেই বই নিয়ে পড়াশোনা করতে চাইতো না ৷তার শিশু সুলভ মন শুধুই  খেলতে চাইতো ৷আর ভাবতো কখন রাত কেটে ভোর হবে ৷সারাদিনের পড়ে যখন অনুর বাবা ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরতো ৷অনু তখন তার বাবার গলা জরিয়ে আদর  করতো ৷তখন বাবা আমাদের চার বোনকে কাছে নিয়ে আদর করতো ৷যেন সারাদিনের ক্লান্তি দূর করছে  ৷ছোটো বোন তখন খুব ছোটো ,ওকে কোলে, আমাকে কাঁধে ,মেজদি , বড়দিকে বুকে নিয়ে বাবার কি সুখ ৷বাবার মাথায় ঝাঁকা ঝাঁকা কোঁকরানো চুল ছিল ৷যেদিন বাবার ছুটি থাকতো ,আমরা তিন বোন একসাথে সবাই মিলে বাবার মাথায়  অনেক গুলো ছোটো ছোটো চুল বেঁধে দিতাম ৷ মা তাই দেখে কি হাসতো ৷এক বার হাসি সুরু করলে আর থামতো না ৷সেই দিন গুলোর কথা মনে পড়লে এখনোও মনটা খুশিতে ভরে ওঠে ৷রবিবারে বাবার ছুটির দিনে বাবা আমাদের তিন বোনকে সাঁতার কাটা শেখাতো ৷খুব মজা করেছি ছোটো বেলার দিন গুলোতে ৷

এমনই একদিন রাতে আমাকে বাবা বললো পাশের বাড়িতে বড়দি আর মেজদি পড়তে গেছে ৷আমি যেন বড়দি আর মেজদিকে ডেকে নিয়ে আসি রাতের খাওয়ারের জন্য ৷কিন্তু আমি তো ঠাই দাড়িয়ে আছি কিছুতেই বাইরে যাবো না ৷বাইরে যে ভূত আছে ৷আমি গেলেই ভূত আমাকে খেয়ে নেবে ৷জানি তো বাইরে অন্ধকারে তাল গাছে ভূত থাকবেই ৷আমি চুপ করে দাড়িয়ে আছি দেখে বাবা  জানতে চাইলো কিরে যা দিদিদের ডেকে নিয়ে আয় এই ভাবে দাড়িয়ে আছিস কেন ? রাত হয়েছে সবাই মিলে একসাথে রাতের খাওয়ার খাবো ৷আমি তখন ভয়ে ভয়ে বাবাকে বললাম জানো বাবা বাইরে অন্ধকারে ভূত থাকে ৷আর ভূত গুলো সবাই বড়ো বড়ো তাল গাছে বসে আছে আমি যাবো না বড়দি মেজদিকে ডাকতে ৷আমার কথা শুনে বাবা তো খুব রেগে গেল ৷মা তখন রান্না ঘরে রাতের রান্না করছে ৷হঠাৎ বাবা আমার হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেল তাল গাছের তলায় ৷মা কিন্তু সব জানে আমি খুব ভূতের ভয় পাই ৷কিন্তু মা কে সব কথা জানানোর সময় পেলাম না ৷আমি তো বাবার হাত শক্ত করে ধরে ভয়ে চোখ বন্ধ করে কাঁদতে শুরু করলাম ৷আমার কাঁন্না দেখে বাবা আরোও রেগে গেল ৷বাবা জোরে জোরে বলতে লাগলো ভূত ভূত তুমি কি এখানে আছো ?তাহলে এখানে নেমে আসো ৷কিন্তু দুঃখের বিষয় তখন একটাও ভূত নেমে আসলো না ৷তখন বাবা বললো আমাকে দেখা কোথায় তোর ভূত ? আমি তখন থর থর করে কাঁপছি ৷হঠাৎ বাবা বলে উঠলো চল আরোও এক ভূতের জায়গায় নিয়ে যাচ্ছি তোকে ৷দেখি সেখানে কোনও ভূত খুজে পাই কি না ৷বলে আমার হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেল সেখানে ৷
আমার কোয়াটারের এক পাশে একটা বড়ো পুকুর আর তার আর এক পাশে একটা বিশাল কালী মন্দির ৷আর মন্দিরের সংলগ্ন এক বিশাল বড়ো মাঠ ৷ধু ধু করা মাঠ সেখানে অনেক ধরনের খেলা হয় ৷আর এই ধুধু করা মাঠের এক পাশে বড়ো একটা তেতুল গাছ ৷আশে পাশে কোনও বাড়ি বা লোকজন কোথাও কেউ নেই ৷শুধু বাবা আর আমি ,বাবা যথারিতি সেখানে নিয়ে গেছে ভূত দেখানোর জন্য ৷বাবা চিরদিন খুব সাহসী ছিল ৷সে মানতেই পারেনি যে তার মেয়ে হয়ে আমি এতো ভীতু হবো ৷ তখনও বাবা তেতুল গাছের তলায় ভূতের আহ্বান করে চলেছে ৷আর আমি ততোক্ষনে ভয়ে কাঠ হয়ে কাঁপছি ৷গলা শুকিয়ে যাচ্ছিল ,কিছু কথা বলার অপেক্ষায় ছিলাম না ৷ বাবাকে আমার ভয়ের কথা কিছুই বলতে পাচ্ছি না ৷আমাকে ওখানে বসিয়ে রেখে বাবা বাড়িতে ফিরে গেল ৷আর আমাকে বলে গেল তুই এখানে বসে ভূত খুজতে থাক ৷আমি যখন ফিরে আসবো আমাকে তখন বলবি তুই কটা ভূত দেখলি ,এই বলে বাবা চলে গেল ৷আমি তখন খুব ছোটো পাঁচ বছর ৷তেঁতুল গাছের তলায় বসে কাঁদতে কাঁদতে ভয়ে চোখ বন্ধ করে বসে থাকলাম বেশ অনেকক্ষন ৷কিছুক্ষন পড়ে চোখ খুলে তাকিয়ে দেখি চারিদিকে ঘুট ঘুটে অন্ধকার ৷ধু ধু করা ফাঁকা মাঠ কোথায় কোনো জন মানব নেই ৷শুধু আমি একা বসে আছি ,চারিদিকে ঝিঝি পোকার ডাক ,চোখের সামনে কতো জোনাকির মেলা ৷এই জোনাকি গুলো আমার চার পাশে ঘুরছে ,কখনও আমার হাতে কখনও আমার গালে মাঝে মাঝে এসে বসছে ৷ প্রথম দিকে ভেবেছিলাম এরাই বুঝি ভূত ৷কখনও দেখিনি কিনা ,ভূত কেমন দেখতে হয় কিছুই তো জানি না ৷জোনাকিকে ভূত ভেবে চিৎকার করে উঠি ,মা গো..... আমাকে বাঁচাও ,ভূত আমাকে খেয়ে ফেললো ৷কিন্তু আমার কথা শোনার মতো কেউ কোথাও এখানে নেই ৷অনেকক্ষন বসার পড় এক সময় আমার কাঁন্নাটা থেমে গেল ৷শুধু একটাই কথা ভাবছি ,আমি এখনও ভূত খুজে পেলাম না কেন ?ভূত গুলো কি কোথাও বেড়াতে গেছে ?তখন আমার শরীর ভয়ে পাথর হয়ে গেছে ৷আমি নিজে নিজে উঠে দাড়াতে পাচ্ছিলাম না ৷আমার চিৎকার করার ক্ষমতাও হারিয়ে গেছিলো ৷কি করবো বুঝেতে পাচ্ছিলাম না ৷ তেতুল কাছের তলায় বসে বসে বেশ কিছুক্ষন কিছু জোনাকি ধরে ধরে আমার জামার পকেটে জমা করতে থাকলাম ৷ অনেক সময় হয়ে গেল এবার তো চিন্তা হচ্ছে বাবা কেন আসছে না ৷ বসে বসে আকাশের তারা কখনও চাঁদ দেখতে দেখতে আবার কখনও মশা মারতে থাকলাম ৷অনেক দেরি করে এক সময় বাবা ফিরে আসলো ৷এসেই বাবা জিঙ্গাসা করলো এবার বল দেখি তুই এখানে কটা ভূত দেখলি ?পেয়েছিস কি একটাও ভূত খুঁজে ?আমি তো ইচ্ছে করেই দেরি করে এলাম ৷ভাবলাম একটু বেশি সময় দিলে হয়তো অনেক বেশি করে ভূত খুঁজে পাবি ৷বাবা হাসতে হাসতে বললো কিরে বল চুপ করে আছিস কেন ?কটা ভূত খুঁজে পেলি বল আমিও একটু শুনি ৷আমি মাথা নিচু করে গম্ভীর স্বরে বললাম একটাও না ৷আমি বেশ রেগে রেগে বললাম ,কিন্তু বাবা তুমি এতো দেরি করে আসলে কেন ? বাবা একটু কাছু মাছু করে বললো আমি তো তোর কথা ভূলেই গেছিলাম ৷ঘরে যাওয়ার পর তোর মা চা বানিয়ে দিলো ৷আর চা খেতে খেতে ,একথা সেকথা বলতে বলতে আমি একদম ভূলে গেছি ৷ শোন মা আমাকে ক্ষমা করে দে বলে,আমাকে কোলে তুলে নিলো ৷তারপর আমার মুখে কি হাসি ৷বাবার গলা জরিয়ে সব জোনাকিদের দেখিয়ে উড়াতে থাকলাম ৷সব জোনাকি যখন উড়ে যাচ্ছিলো ৷তখন আমার মনে হলো ওরা আমাকে টাটা দিয়ে বিদায় জানাছে ৷আর বলছে তোমার বাবা এসে গেছে এবার আমরা চলে যাচ্ছি ৷আর তোমার ভয় লাগবে না ৷আমিও হাত নেড়ে নেড়ে  জোনাকিদের বিদায় জানালাম ৷সেই মুহুর্তটা খুবই সুন্দর ছিলো ৷ওরা না থাকলে আমি হয়তো ভয়ে মরেই যেতাম ৷বাবা তখন বললো এবার বলতো মা কোথাও কি কোনো ভূত আছে ? দেখেছিস  একটাও ভূতকে ৷বাবাকে বললাম না বাবা আমি কোথাও ভূত খুঁজে পেলাম না ৷বাবা তুমিই ঠিক ,সত্যি ভূত কোথাও নেই ৷বাবা আর আমি কোনোদিন ভূতের ভয় পাবো না ৷ এবার দেখছি বাবা খুব চিন্তিত ৷আমি বললাম বাবা কি হয়েছে ?তুমি কিছু বলছো না কেন ?বাবা তখন বললো একটা সমস্যা আছে রে মা ৷ আমি বললাম কিসের সমস্যা বাবা ?তোর মা যদি জানে আমার এই ছোট্ট মেয়েটাকে একা অন্ধকারে গাছের নিচে মাঠে বসিয়ে রেখেছি ,তাহলে তোর মা আমাকে  খুব বকা দেবে ৷আর খুব অশান্তি করবে ৷এবার তোর মাকে গিয়ে কি বলবো ?আমি হেসে বললাম তুমি চিন্তা করছো কেন ?আমি মাকে কিছুই বলবো না ৷আমাকে কিছু বললে বলবো আমি তো ঘরের ভিতরেই ছিলাম ৷এই কথা বলতে বলতে পা টিপে টিপে এক দৌড়ে ঘরের ভিতরে ঢুকে গেলাম ৷সেইদিন রাতে আর আমি ভয় পাইনি ৷আমি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম ৷সকাল সকাল ঘুম ভেঙে উঠেই খুব ভালো লাগছিলো ৷মনের ভিতর কোনো ভয় আর অবশিষ্ট ছিল না ৷তখন বুঝিনি যে বাবা আমার জন্য কতোটা ভেবেছিলো ৷আমার জীবনের মূল্যবান শিক্ষাটা দিয়েছিলেন ৷আজ বড়ো হয়ে বুঝেছি জীবনে চলার পথে মনের সাহসটা কতোটা প্রয়োজন , বিশেষ করে মেয়েদের ৷বাবা আমি মেয়ে বলে আগলে  না রেখে আমাকে সাবলম্বী আর সাহসী করে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন ৷যতো বড়ো হয়েছি এটাই বুঝেছি যে ভূতের ভয় পেতাম ছোটো বেলায় ৷বাস্তবে কখনই এমন ভূতের সন্ধান আমি পাইনি ৷কিন্তু এই আধুনিক যুগে শিক্ষার আড়ালে হিংস্র কুৎসিত ভূত আছে মুখোষের আড়ালে ৷যাদের থেকে অবশ্যই সাবধান হতে হয় ৷আর তাদের সঠিক শাস্তি দিয়ে উচিত জবাব দিতে হয় ৷

বাবা তুমি আজ আমাদের মধ্যে নেই ৷কিন্তু তোমার চিন্তাভাবনা ,মূল্যবান শিক্ষা চিরদিন আমার সাথে থাকবে ৷আমাকে তুমি অনেক সাহসী করেছো ৷সেই দিনের পর থেকে ভয় কি জিনিস আমি বুঝিনি ৷এরপর কতো শ্মশান,কতো কবরস্থান ঘুরেছি রাতের অন্ধকারে ৷ এমন জায়গায় গেছি যেখানে কেউ দিনের বেলাতেও যেতে  সাহস করেনা ৷আমি আমার মনের ভয়কে জয় করেছি বাবা শুধু তোমার জন্য ৷

জানো বাবা আজ তুমি নেই বলে আর তোমাকে মায়ের কাছে বকা খেতে হলো না ৷আজ এতো বছর পড় সেই দিনের ঘটনা হঠাৎ কথায় কথায় মা কে বলে ফেলি  ৷মা এর কি রাগ জান তোমাকে সামনে পেলে যেন খেয়েই নেবে ৷তখন মা কে বোঝালাম বাবা যদি সেই দিন এই কাজটা না করতো ,আজ আমি তাহলে এতো সাহসী হতাম না ৷

আমিও চাই বাবা আমার মেয়েদের এমনই সাহসী করে গড়ে তুলবো ৷আমাকে আর্শীবাদ করো আমি যেন শুধু ভূত নয় এই সমাজে যেখানে অন্যায় দেখলে ভয় পেয়ে পিছিয়ে না যাই ৷অন্যায়ের বিরুদ্ধে সর্বদা প্রতিবাদ করি ৷৷


Post a Comment

2 Comments