পরদেশী মেঘ
নবনীতা সই
মেয়েটাকে ঘুম থেকে বড় কাজ হয়ে গেছে৷ সুমি উঠলি? সুমি ...
আমার লেট হচ্ছে , উঠে পড়৷ কলেজ যাবিনা?
উফ! মা ঘুমাতে দাও তো৷ আমি দেরী করে যাবো৷
তোর ক্লাস নেই ?
বারোটার পর৷ আমাকে ঘুমাতে দাও ৷
আচ্ছা শোন না৷
হুম৷
খেয়ে নিস ঠিকমত৷ কাল কিন্তু না খেয়ে চলে গেছিস৷
হুম৷
শুনছিস কি?
আরে হ্যাঁ শুনেছি৷
তড়িঘড়ি রেডি হয়ে জবার মা কে পইপই করে বলে যখন বেরোতে যাবো , অতনুর ফোন৷
হ্যালো
তুমি বেরিয়েছো?
আচ্ছা বলো তো তুমি কি করে টের পাও ? সিঁড়িতে পা দিয়ে পারিনা তোমার ফোন ঠিক বেজে ওঠে৷
আসলে তোমার ঘরে আমার এন্ট্রি নেই কিন্তু যেই ঘরের পৃথিবীটা কে পিছনে রেখে বাইরে পা দাও তখন আমার বুকে ঠিক এ্যালার্ম বাজে৷
হয়েছে হয়েছে , বাবা কত কাব্য৷
তুমি তো আমার কাব্য শুভ্রা৷ তোমার চোখে..
থাক থাক , কোথায় আছো?
তোমার অপেক্ষায় , রাস্তার মোড়ে৷
আসছি রাখো৷
ফোনটা রেখে জয় মা তারা বলে বেরিয়ে পড়লাম ৷ রাস্তার মোড়ের বড় ছাতিম গাছটার পাশে অতনুর ব্লু কালারের গাড়িটা দেখা যাচ্ছে ৷ রাস্তার দুপাশ দেখে পার হয়ে উঠে বসতেই অতনু বলে ওঠে জানো শুভ্রা তোমার প্রেমে রোজ পড়া যায়৷
হুম৷
কি হলো? আজ শুধু হুম, বকা দিলে না? কি ভাবছো?
জানো সুমিটা না...
তুমি বেশী ভাবছো শুভ্রা৷ সবঠিক হয়ে যাবে , বড় হচ্ছে মেয়ে৷
জানি ৷ কিন্তু আমি জানি ওর মনে কিছু চলছে৷ বাদ দাও ৷ আজ তোমার প্ল্যান বলো৷
আমার আবার কি, তোমাকে অফিসে দিয়ে কলেজে যাবো৷ তারপর সারাদিন বকবকের মাঝে তোমাকে ভাববো৷ তারপর আবার ফেরার সময় তোমায় নিয়ে হারিয়ে যাবো৷
কোথায় যাবে?৷
আজ চলো গঙ্গার ধারে বসি৷
হুম ঠিক আছে ৷ কিন্তু শোনোনা কিছু জিনিস কিনতে হবে৷
তোমার যা লাগবে তুমি হোয়াট এ্যপ করে দিও, আমার আজ দুটো ক্লাস অফ আছে আমি কিনে নিয়ে যাবো৷
লক্ষী সোনা৷
জানি তো ৷ তবে সোনা না আমি লক্ষী পেঁচা৷ তোমার৷
বুলা মাসি , ও বুলা মাসি...
আসছি৷
আমার জন্য গ্রীন টি দাও আর দুটো বিস্কুট একটা পোচ৷
ভাত খাবেনা? দিদি যে বলে গেলো মাছের তেল দিয়ে ভাত দিতে৷ ইলিশ মাছের তেল , তোমার যে বড় পছন্দ ৷
যা বলছি দাও , পছন্দ পাল্টে গেছে৷
ফোনের মেসেজ ঘাটতে ঘাটতে খাবার টুকু খেয়ে জাম কালারের নতুন টপটা পরে আয়নায় নিজেকে দেখে নেয় সুমি৷ কে বেশী সুন্দর ? আমি না মিসেস শুভ্রা চ্যাটার্জী ?
ফেরার সময় খুব জ্যাম থাকে তবুও অতনু রোজ ঠিক সময়ে অফিসের গেটে পৌছে যায়৷ আজকাল অতনু কে নিয়ে অফিসে আর কানাঘুষো হয়না৷ সবাই জানে অতনুর ব্যাপারটা৷ হয়ত সবাই বোঝে৷ শুধু আমার নিজের মেয়ে বাদে৷
সেই তিন বছরের মেয়ে কোলে রেখে বিভাস চলে গিয়েছিলো৷ তারপর শুধু লড়াই আর লড়াই ৷ কত কাঠখড় পুড়িয়ে বিভাসের চাকরীটা পেয়েছি সেটা আমি জানি৷ মা ছিলো সাথে তাই ছোট্ট সুমির কোন অসুবিধা হয়নি৷ জবার মা, আর আমার মা দুজনে মিলে মেয়েকে মানুষ করেছে৷ আর আমি? আমি কম করেছি? মাত্র ছাব্বিশ বছরের যৌবন কে পায়ে মাড়িয়ে মেয়ে বুকে নিয়ে লড়াই ৷ ছোট দেওর কে বিয়ে করার জন্য চাপ দিয়েছিলো শাশুড়ি মা৷ তখন শশুরবাড়ি ছাড়তে হলো৷ মা অাসাতে দাদা বলেছিলো , মা কে নিয়ে যাচ্ছিস তোর বৌদি দুটো ছেলে সামলাবে কি করে? তারপর যেই মা বৃদ্ধা হবে ফেলে যাবি আমার ঘাড়ে৷
না মা কে আমি ফেলিনি , মৃত্যুর আগ অবধি যত্ন করে গেছি ৷ মায়ের মৃত্যুর পর জীবন টা সত্যিই ফাঁকা হয়ে গিয়েছিলো ৷
মা চেয়েছিলেন আমি আবার সংসার করি আর সেই জন্য বিবাহবন্ধনী অফিসে যোগাযোগ করে খুঁজে এনেছিলেন ভালো সমন্ধ৷
ছেলে চাকরী করে , ডিভোর্সী৷
সে এক ইতিহাস৷ বিয়ের সবকিছু ফাইনাল৷
প্রায় অনিমেষের যাতায়াত ৷ সবাই কে জানানো, চোখ ভ্রু কুঁচকালেও কেউ তেমন আপত্তি করেনি৷ কারন সুমি মেনে নিয়েছিলো৷ অনিমেষ কে বাবা বাবা বলে গলা জরিয়ে ধরতো৷ খুব ভালো ভাবে মেনে নিয়েছিলো আট বছরের সুমি অনিমেষ কে৷
কিন্তু বিয়ের আগেই ভগবানের কৃপায় মুখোশ খুলে পড়েছিলো অনিমেষের৷ প্রথম পক্ষের স্ত্রী নিজে দেখা করে বলেছিলো মানসিক রুগী অনিমেষ ৷ প্রতিনিয়ত ওষুধ না খেলে মানসিক ভারসাম্য হারায়৷ সব ডাক্তার আর প্রেসক্রিপ্শন দেখে , অনিমেষ কে সরাসরি জিজ্ঞাসা করেছিলাম ৷ কোন উত্তর ছিলো না, অনিমেষের কাছে৷ হাত দুটো ধরে অনুরোধ করছিলো, বলেছিলো অনিমেষ ওষুধ খেলে সুস্থ থাকে৷
না রিস্ক নিতে পারিনি৷ মেয়ের ভবিষ্যৎ ভেবে পিছিয়ে এসেছিলাম ৷
তারপর কেটে গেছে কত বছর , মা আর সাহস করেনি আমার ঘর বাঁধার৷ আমিও গুটিয়ে ছিলাম ৷ অফিসে বিধবা কর্মরত মহিলার প্রতি যে হেনস্তা সবাই মজা করে উপভোগ করে তাতে ঘৃণা হয়ে গিয়েছিলো পুরুষের প্রতি৷
মায়ের মৃত্যুর পর পরিচয় হয় অতনুর সাথে৷ ফেসবুকে ৷ মায়ের মৃত্যুর পর বেশ কিছুটা সময় ফেসবুকে কাটতো৷ সেখান থেকে আলাপ, বন্ধুত্ব ৷ অল্পভাষী , অবিবাহিত আর সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ অতনুর সাথে মনে হয়েছিলো আজন্মের বন্ধন বাঁধা৷
অতনুর মা বাবা মারা গেছেন বেশ অল্প বয়েসে ৷ তখন অতনু সবে কলেজ জয়েন করেছে৷ তিনটে বোন কে পাশ করিয়ে পাত্রস্থ করতে করতে বেশ বয়েস হয়ে যাওয়া অতনুর আর সংসার করা হয়নি৷ নিজের ফ্ল্যাটে তাই পুরো একা অতনু৷ বোনেরা আজ সংসারে ব্যস্ত ৷ তাদের ছেলে মেয়েরা পড়াকু মামার ফাঁকা ফ্ল্যাটে আসতে চায়না বেশী ৷ তাই যোগাযোগ ক্ষীণ হয়ে গেছে৷
গাড়ির হর্ণে চমক ভাঙে শুভ্রার৷
তুমি বুঝতে পারছোনা বিকাশ ৷
মা আমাদের সম্পর্ক মেনে নেবেনা৷ আমাদের পালাতেই হবে৷
তুমি পাগোল হয়েছো?
কেন ? এতে পাগলামির কি হলো?
সুমি অবুঝ হয়োনা৷ আমি সামান্য চাকরী করি আর তোমার মায়ের একমাত্র উত্তরাধিকারী তুমি৷ তোমাদের ঐ পজিশনের ফ্ল্যাট আর সবকিছু ফেলে তুমি চলে যাবে?
তাহলে মায়ের মরা পর্যন্ত অপেক্ষা করো৷ মা কোনদিন মানবে না৷
অত অধৈর্য হয়ে যাও কেন?
কারন আমি ঐ মহিলাকে আর নিতে পারছিনা৷ তুমিই তো বলেছো যে আমার নিজের জন্য ভাবা উচিত মায়ের আঁচল থেকে বেরিয়ে এসে৷
সেটা ভাবনার ক্ষেত্রে সুমি , সম্পত্তির ক্ষেত্রে নয়৷ তুমি কি চাও ? তুমি বেরিয়ে আসলেই সবকিছু ঐ অতনু হাত করে নেবে সেটা হোক?
অসম্ভব ! ঐ লোকটাকে আমি দেখতে পারিনা৷ একবার ঠকেও শুভ্রা চ্যাটার্জীর শিক্ষা হয়নি৷
বাদ দাও , চলোনা আমার ফ্ল্যাটে৷
আজ না৷
কেন?
পিরিয়ড চলছে৷ আর শোনো শুধু সেক্স সেক্স করে পাগল হয়োনা কাজের কাজ করো৷ ভালো একটা চাকরী খোঁজো৷ আমি চলি৷
আরে শোনো না ক্ষিদে পেয়েছে৷
চলো খাওয়াচ্ছি কিন্তু আমি খাবোনা৷
কেন?
মা খুব ক্যাটক্যাট করবে৷ কালকেও কুরকুর করছিলো৷ বাড়ি গিয়ে খাবো৷
আচ্ছা চলো আমাকে তো খাওয়াও ৷
কটা বাজে সুমি?
ঘড়িতে দেখে নাও ৷ আমি ট্রায়াড৷
এত রাত হয়ে গেছে কোথায় ছিলি?
আড্ডা দিচ্ছিলাম ৷ কি করবো? বাড়ি বসে টিভি সিরিয়াল দেখবো?
কেন পড়বি৷ রাত আটটা বাজে, দুপুরে সামান্য ডিম পোচ খেয়ে বেরিয়েছিস , শরীর থাকবে? আর তোকে বলেছি না ফোনটা ধরবি ফোন করলে৷
মা ফোন আমি ধরিনা তুমি জানো৷ আমি কলেজ শেষে টিউশন করে ফিরলাম , এত লেকচার না দিয়ে খেতে দেবে? খুব ক্ষিদে পেয়েছে৷
খুব খুব রাগ হয়েছিলো কিন্তু সুমির শুকনো মুখটা দেখে আর বকতে ইচ্ছা হলোনা ৷ মেয়েটা কবে যে এতদুরে সরে গেলো৷ আমি কি কোথাও ভুল করলাম ? না অতনুর জন্য সুমিকে সময় কম দিলাম ৷ নাহ্ যতক্ষণ সুমির সাথে থাকি আমি তো ফোন ধরিনা কারোর৷ কি যে হলো৷
সুমি আয় , খাবার গরম করেছি৷
আসছি৷
রাতে অতনু ফোন করে, তুমি ঘুমাও নি?
না ঘুম আসছে না৷
কবে তুমি আমার কাছে আসবে?
হয়ত কোনদিন না৷ আর হ্যালো আমি কেন যাবো? তুমি আসবে আমার কাছে৷ আমার ফ্ল্যাটে থাকতে৷
না না শোনো না আমি বলছি কি তোমার ফ্ল্যাট টা সুমিকে দিয়ে দিও ৷ তুমি আর আমি বেশ গঙ্গার ধারে কোন আবাসনে ফ্ল্যাট নেবো৷
তোমার ফ্ল্যাট টা কি হবে মশাই ?
বিক্রি করে দেবো৷ আমি আমার সব সঞ্চয় আর এই ফ্ল্যাট বিক্রির টাকায় সুন্দর একটা ফ্ল্যাট কিনবো৷ তারপর দুজনে সংসার গুছাবো৷ বেতন দিয়ে তুমি সংসার চালাবে৷ আর তোমার বেতন জমাবে সুমির জন্য৷ তোমার সব সঞ্চয় সুমির৷ আর যখন থাকবো না নতুন ফ্ল্যাট টাও সুমিকে দিয়ে যাবো৷
আর তোমার বোনেরা?
তাদের সব ভালো ঘরে বিয়ে হয়েছে৷ তিন জনের নামে আমি তিনটে এফ ডি করে দিয়েছি৷ ব্যাস৷
বাহ্ কত পরিকল্পনা গো তোমার৷
হুম আমি তো সারাদিন এসবই ভাবি৷ কবে তুমি আসবে আমার ঘরে, লাল টুকটুকে..
নাইটি পরে.
নাইটি?
হ্যাঁ তুমি কি ভাবো আমি ঘরে শাড়ি পরে থাকি?
ইশ দিলে তো কল্পনা মাটি করে৷
হা হা হা বেশ করেছি , ঘুমাও ৷ বহু দেরী আছে৷ আগে সুমির পড়া শেষ হবে৷ সুমি চাকরী করবে , বিয়ে করবে৷
জানি জানি অনেকদেরী, আমি অপেক্ষা করবো৷ বুড়ো হয়ে গেছি জানি, শেষ সময় পর্যন্ত আমি অপেক্ষা করবো৷
এখন ঘুমাও ৷
পাশের ঘরে সুমি জেগে জেগে ভাবে,
কি হাসির ফোয়ারা৷ গা জ্বলে যায়৷ অত প্রেম যখন বিয়ে করে নিলে পারে৷ না না সেটা পারবে না ৷ আমি হতে দেবোনা৷বিকাশ ঠিক বলে , আমার সুখের চিন্তা মায়ের নেই ৷ খালি নিজে কবে বিয়ের পিঁড়িতে বসবে সেই স্বপ্ন দেখছে৷
হ্যালো..
তোমার ফোন বিজি ছিলো কেন?
কখন?
আমি কখন থেকে ট্রাই করছি৷
ধুর আমি তো পড়ছিলাম ৷ কি করছো?
কাল বাড়ি যাবো তাই গোছগাছ ৷
ওহ কাল শুক্রবার ৷
হ্যাঁ অফিস থেকেই বেরিয়ে যাবো৷
ধুর আমার এই দুদিন সময় কাটবে না৷ আমাকে নিয়ে চলো না এবার?
তোমার মাথা খারাপ সুমি? অজ পাড়াগাঁ ৷ বাবা মা আমার সেকেলে৷
তাহলে কি হবে?
কি হবে? কিছু হবেনা৷ আমি তোমায় ভালোবাসি সুমি৷ আমি তোমায় কষ্ট দিতে পারি? আমি কোনদিন তোমায় ঐ গাঁয়ে থাকতে বলবো না৷ তুমি যদি আমার জন্য নিজের মা কে ছাড়তে পারো আমারও উচিত তোমার জন্য বাবা মা কে ছেড়ে থাকা৷ হ্যাঁ খরচ পাঠাবো অবশ্যই৷
হ্যাঁ হ্যাঁ কেন পাঠাবে না৷ আমি গাঁয়ে থাকতে পারবোনা কিন্তু তারা তোমার কাছে এসে থাকলে আমার আপত্তি নেই ৷
না না সুমি আমরা শুধু দুজনে থাকবো৷ তুমি কোন চিন্তা কোরোনা৷
তুমি আমায় এত ভালোবাসো?
ভীষন ভালোবাসি সুমি৷ তবে জানো এবার দুদিন দেরী হবে আসতে৷
কেন??
মায়ের শরীর খারাপ৷ কিছু টাকা জোগাড় করে ডাক্তার দেখিয়ে আসতে হবে৷ আমার তো বেতন হয়নি এখনও ৷ তাই দুদিন দেরী হবে৷
না না একদম না৷ তুমি সোমবার আসবে৷ সোমবার বিকালে আমি তোমার ফ্ল্যাটে যাবো৷
কিন্তু
কোন কিন্তু না৷ আমি কিছু টাকা তোমার এ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করে দিচ্ছি ৷
সো সুইট বেবী৷
এতটাকা কি করবি?
লাগবে৷
লাগবে আমিও জানি কিন্তু কারনটা জানতে চাই৷
সবকিছু বলতে হবে?
না বলার কারন টা কি? আমি তোর মা সুমি৷ আগের মাসে তুই চারহাজার টাকা নিয়েছিস৷
আমার কি খরচ নেই ?
কেন থাকবে না৷ কিন্তু সেটা প্রতিমাসে বেড়ে যাচ্ছে ৷ আমি এতটাকা দিতে পারবো না৷
কেন পারবে না? তোমার কাছে নেই ?
নেই তা তো বলিনি৷ তোর সব টিউশন , কলেজের ফিস, হাতখরচ তো আমি দিয়ে দি৷
ভৃক্ষা দাও না৷ এসব কিন্তু আমার বাবার টাকা৷ বাবার চাকরীটা তুমি করছো৷
সুমি!! আমার সবকিছু ও তোর ৷ কিন্তু জানাবি তো কি করবি?
আমি জিজ্ঞাসা করি তুমি বেতন পেয়ে কি করো? তোমার বন্ধু তো সংসারের আধা খরচ চালায়, নতুন এসি লাগিয়ে দিলো, ফ্রিজ কিনে দিলো ৷ তোমার তো আরও সঞ্চয় হওয়ার কথা৷
ভদ্রভাবে কথা বল সুমি৷ অতনু ...
হ্যাঁ ঐ লোকটা আমাদের সংসারে পুরো নাক গলায়৷ জাস্ট বিরক্তিকর৷
কি সমস্যা তোর অতনু কে নিয়ে?
জানিনা আমি ৷ আমাকে কি টাকা দেবে?
না৷
ওকে৷
আমি তোমার অপেক্ষায় ছিলাম সোনা৷ টাকাটা পেয়েছো৷
না মা দেয়নি৷
ও৷ আচ্ছা ৷ তাহলে আমার দেরী হবে ফিরতে৷
না তুমি সোমবার আসবে৷ দাঁড়াও ৷
হ্যালো
হ্যালো সুমি৷ কেমন আছো?
ভালো৷ অতনু আঙ্কেল আমার কিছু টাকা দরকার দেবে?
কি করবে সুমি?
ও তোমাকেও বলতে হবে? একটা ড্রেস কিনবো৷
না না সেজন্য নয়৷ আচ্ছা আমি পাঠিয়ে দিচ্ছি ৷
হ্যাঁ মা কে বোলোনা প্লিজ৷ আমার এ্যাকাউন্টে দিও ৷
আমি তো শুভ্রা কে কিছু লুকাই না৷ ঠিক আছে বলবো না৷ তবে আশা করবো তুমি এমনকিছু করবে না যাতে তোমার মায়ের কষ্ট হয়৷
না একটা বন্ধুর মা অসুস্থ তাই হেল্প করতাম ৷
আচ্ছা , খুব ভালো কাজ, আমি পাঠিয়ে দিচ্ছি , কত দেবো বলো?
হাজার চারেক৷
আচ্ছা আমি ছ হাজার পাঠাচ্ছি , বাকিটা তুমি একটা ড্রেস কিনে নিও ৷
থ্যাঙ্ক ইউ৷
হয়ে গেলো তো৷
আমার সোনা৷ আচ্ছা ছাড়ো ছাড়ো.... আমার দেরী হচ্ছে ৷ আর শোনো এবার বাবা মা আমার কথাটা বলো৷ আমার আর ভালো লাগছে না ঐ বাড়ি৷
অত অধৈর্য হয়োনা সুমি , আচ্ছা আমি বলবো মা কে৷ আগে দেখি মায়ের কি হয়েছে ৷
হ্যাঁ আর শোন ফোন তো নেটওয়ার্ক থাকেনা তোমার গাঁয়ে গেলে, প্লিজ কোন ভাবে খবর দিও পৌছানোর৷
দেবো৷
সুমি তুই অতনুর কাছ থেকে টাকা নিয়েছিস?
লোকটার পেটে কি কথা থকেনা? বলে দিলো?
না বলেনি আমি জেনেছি তোর ব্যঙ্ক ডিটেলস দেখে৷ আর লোকটা কি আঙ্কেল বলতে পারিস না?
সে তো তুমি চাও আমি বাবা বলি৷ যেমন আগে চেয়েছিলে৷
সুমি! তোর কি হয়েছে টা কি?
চোখ খূলে গেছে আর কিছু না৷
টাকাটা কি করলি?
বিকাশ কে দিয়েছি , ওর মা অসুস্থ ৷
সেটা আগে বললে আমিও টাকাটা দিয়ে দিতাম ৷
আচ্ছা পরে তোমাকেই বলবো৷
সুমি তুই আমার সব৷ কেন এমন করছিস? পড়াশুনায় মন দে৷
আমি কি ভালো রেজাল্ট করিনা?
করিস৷ আমি চাই তুই আরও ভালো রেজাল্ট কর৷ নিজের পায়ে দাঁড়া৷
তোমাকে একটা কথা বলবো শুভ্রা?
বলো অতনু৷
সুমি যে বিকাশ নামের ছেলেটার সাথে মিশছে , ছেলেটা ভালোনা৷ আমার কলেজে পড়তো৷ খুব ভালো রেজাল্ট করেনি সেটা বিষয় না৷ ছেলেটা নেশা করে৷ মেয়ে ঘটিত...
কি বলছো!! ছেলেটা সুমির বন্ধু৷
বন্ধু শুধু নয়৷ সেদিন সুমি টাকাটা নেবার পর আমি খোঁজ করিয়েছিলাম ৷ সামান্য চাকরী করে৷ গাঁয়ে যায় সপ্তাহে দুদিন৷ খুব সম্ভব ছেলেটা বিবাহিত ৷
সে কি???
হ্যাঁ ৷ এ যাবৎ অনেক টাকা সুমি ছেলেটাকে দিয়েছে৷ ওর কলিগ আর ও যেখানে থাকে সেই বাড়ির মালিক বলছিলো ওদের শারীরিক ..
চুপ করো অতনু!! আর পারছিনা৷ আজ আসি৷
সুমির সামনে ফাইনাল কিছু বোলোনা ওকে৷ পরে দেখা যাবে৷
হুম৷ কিন্তু প্লিজ ছেলেটার সব খোঁজ নাও ৷
তুমি না বললেও নিতাম ৷
তুই আর পড়বিনা মানে কি?
মানে আর পড়বোনা৷
কি করবি?
বিয়ে৷
ঐ বিকাশ কে?
হুম৷ আর তুমি চাকরী করছো আমি অার চাকরী করতে চাইনা৷
ছেলেটা তো সামান্য চাকরী করে , চলবে কি করে?
টাকা দেবে তুমি৷ বিকাশ ব্যবসা করবে৷
বাঃ কি সুন্দর হিসাব৷
কেন ? তুমি কি চাওনা আমি বিয়ে করি?
চাই ৷ তবে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে৷
বললাম তো ব্যবসা করবো৷
ভালো৷ তবে ব্যবসা তোর নামে হবে৷
সেটার দরকার নেই ৷ আমার বাবার গচ্ছিত টাকা আমায় দিয়ে দাও ব্যাস৷
সুমি ভুল করিস না৷
তুমি ভুল করোনি? এক মানসিক রুগী কে আমার বাবা বানাচ্ছিলে?
সুমি তোর বিয়ের বয়স হয়নি৷
ও ঠিক৷ বিয়ের বয়েস তো তোমার৷ সরি৷
এত ছোটলোক কবে হলি সুমি?
যেদিন ঐ অতনু
চুপ৷ আর কথা নয়৷ আজ দুমাস আমি তোকে পইপই করে বুঝিয়ে যাচ্ছি , ভরতি হ৷ তুই নিজের পায়ে দাঁড়া৷ আর না৷ তোর এ্যাকাউন্টে তোর বাপের সব গচ্ছিত টাকা আমি দিয়ে দেবো৷ আর হ্যাঁ এই ফ্ল্যাট টাও দিয়ে দেবো তবে সেটা তোর বিক্রির অধিকার থাকবে না৷ কারন আমি জানি তুই ঠকবি৷
হ্যাঁ ঠকবো৷ নিজে ঠকবো ৷ তোমায় বলতে যাবো না৷
সুমি এতবড় ভুল করিস না৷ বিকাশের পরিবার তুই দেখেছিস?
দেখার দরকার নেই ৷ ও আমার সাথে থাকবে ৷ বাবা মায়ের সাথে নয়৷
আর আমি যদি বলি বিকাশ বিবাহিত ৷
মিথ্যা৷
সত্যি কিনা খোঁজ তো নে৷
কোন দরকার নেই ৷ বিবাহিত হলে বৌ কে ছেড়ে দেবে৷ কোন সমস্যা না৷
কি বলছিস সুমি?
যা শুনছো৷ বিকাশ চাকরী করবে না ৷ আমরা দুজনে ব্যবসা করবো৷
ঠিক আছে ৷ তুই যা চাস পাবি৷ তবে মা পাবিনা আর৷
তারপর কেটে গেছে ছবছর৷ আজ ও শুভ্রা আর অতনু বন্ধু৷ না সংসার করা আর হয়নি৷ কিন্তু কিছু কিছু ভালোবাসা থাকে যেগুলো সম্পর্কের বাঁধনে বাঁধা না থাকলেও ভালোবাসা বেঁধে রাখে৷ শুভ্রা জানতো সুমি ঠকবে৷ এ এক অসহ্য যন্ত্রণা ৷ নিজে জানি অথচ প্রিয়জন কে বোঝানো যাচ্ছে না৷
শুভ্রা চাকরী থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে কোলকাতা থেকে দুরে চলে যায় ৷
অতনু যোগাযোগ করে দেয়, ধুবুলিয়ার একটি স্কুলে৷ সেখানে থাকার জায়গা আছে৷ আবাসিক এই মেয়েদের স্কুলটা জার্মান একটি সংস্থা আর ভারত সেবা সংঘের পরিচালনায় চলে৷
মেয়েদের বেশ বড় স্কুল ৷ পিছনটা হোস্টেল৷ তারও পিছনে হালকা নীল পাহাড়ের রূপরেখা ৷ লাল পলাশ , শিমুল আর মহুয়ায় মোড়া দিগন্ত একদিকে৷
শুভ্রার ক্ষতে প্রলেপ ৷ আর ভাবেনা শুভ্রা৷ শুধু প্রার্থণা করে , তার সব ধারণা আর চিন্তা যেন ভুল হয়৷ বিকাশ যেন সুমি কে খুব খুব সুখী করে৷
খুব কম বেতনে , শুভ্রা স্কুলে কাজ শুরু করে৷ তার সাথে আরও পাঁচজন মহিলা আছেন হোস্টেলে৷ তাদের মধ্যে তিনজন অবিবাহিতা ৷ আর বাকি দুজন শুভ্রার মতন বিধবা৷ তবে বাকি সবাই শুভ্রার থেকেও অনেক বড়৷
কোলকাতা থেকে গিয়ে , ওরকম লাল মাটির পরিবেশে, গরমে শুভ্রা যে থাকতে পারবে সেটা কেউ ভাবতে পরেনি৷ অতনু জানতো শুভ্রা পারবে, কারন মনের ভিতরে বেশী জ্বলছে শুভ্রার ৷ শান্তি নেই কোথাও , চারিদিকে নৈরাশ্য ৷ কাউকে বোঝানো না গেলেও অতনু বোঝে, অতনুর মন যে শুভ্রার সাথে বাঁধা৷
অতনু কোলকাতা থাকে , শুভ্রার জন্য৷ সুমি কেমন আছে খবরাখবর সব যে জানা দরকার অতনু মাঝে মাঝেই চলে যায় শুভ্রার কাছে, স্কুলের ছুটির দিনে দুজনে চলে যায় ঐ নীল পাহাড়ের গায়ে৷ একটা ছোট্ট ঝোরা যেখানে শুকনো পাতাকে মারিয়ে চলে যাচ্ছে ৷ একটা অাদিবাসী গ্রাম কয়েকটা ঘর নিয়ে আর কয়েক মাইল জুরে শাল পলাশের অরন্য৷ কত গাছ আর পাখি৷
দিনশেষে শুভ্রা কে পৌছে দিয়ে কোলকাতার রাস্তা ধরে অতনু৷
বছর খানেক আগে যখন সুমি কেরল চলে যায় সেই শেষ সুমির খবর পেয়েছিলো শুভ্রা৷
সুমি সবসময় দেখাতে চেয়েছে সে ভালো আছে৷ তাই শুভ্রা সরে গেছে৷ বিশেষ করে বিকাশের কথা ভাবলে, গা জ্বলতো শুভ্রার৷
আজ ছবছর বাদে অতনুর ছোটো বোন ফোন করে৷শুভ্রা আর দেরী করেনি, সোজা কোলকাতা ৷ সেখানে সরকারী হাসপাতাল থেকে সুমি কে নিয়ে চলে যায় ভেলোর৷ মাস তিনেক পর সুমি কোনরকম উঠে বসে৷ দু দুটো অপারেশন , ট্রেস, অপুষ্টি, মানসিক আর শারীরিক অত্যাচার সুমি কে জীবনের শেষ সীমানায় নিয়ে গিয়েছিলো৷ শুভ্রা তো স্তব্ধ হয়ে যায় যখন জানতে পারে , সুমির কিডনি বাদ গেছে৷
খুব অসুস্থ অবস্থায় বিকাশ হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলো ৷ কদিন পর আর আসেনি , ফোন করলে ধরেনি৷ সব কাগজপত্রে নকল ঠিকানা দিয়েছে ৷ সুমির অবস্থা কথা বলার মতন নয় যে কেউ কিছু জানবে ৷ সেখানে অতনুর ছোটো বোন কোনো রুগীকে দেখতে এসে দ্যাখে সুমি পড়ে আছে হাসপাতালে ৷
মাস ছয়েক পর, শুভ্রা মেয়েকে কোলকাতায় অতনুর বোনের ফ্ল্যাটে রেখে, পুলিস নিয়ে সোজা নিজের ফ্ল্যাটে যায়৷ ফ্ল্যাটে তালা৷ পুলিস নিয়ে সোজা বিকাশের গ্রামে যায় শুভ্রা৷ সেখান থেকে বিকাশ কে গ্রেফতার করা হয় ৷
যদিও বিকাশ সব দোষ অস্বীকার করে৷ সুমি কে সে বিয়ে করেনি কোনদিন৷ ওরা জাস্ট বন্ধু ছিলো৷ কেরলে সুমি অসুস্থ হলে , সেখানে কিডনি বাদ দিতে হয় বলে জানায়৷
কি হয়েছিলো সুমির?
আমি জানিনা, ডাক্তার বললো কিডনি খারাপ৷
সুমি যখন আপনার স্ত্রী নয় তখন সুমির কিডনি বাদ দেবার মতন অপরেশনে আপনি কোন অধিকারে সই করলেন?? তাও স্বামীর জায়গায়?
সেটা সুমি কে বাঁচাতে করেছি ৷ ওর মা কোথায় থাকে তো জানিনা৷ শুনেছিলাম মানে সুমি বলেছিলো কোন অতনুর সাথে পালিয়ে গেছেন তাই আমিই সই করলাম ৷
শুভ্রা শুধু বিকাশের নোংরামি আর প্রতারণার স্পর্ধা দেখে অবাক হচ্ছিলো৷ এত কিছু করেও কোন লজ্জা ঘৃণা ওর মুখে নেই ৷
সুমির কিডনির অপারেশনের পর সেলাই পেকে গিয়েছিলো আরও কিছু সমস্যা হচ্ছিলো৷ কিডনি বাদ দেবার পর অসম্ভব যত্নে রাখতে হয় রুগী কে, যেটা বিকাশ করেনি, আর হাসপাতালে ফেলে রেখে , বিকাশ এটাই ভেবেছিলো সুমি মরে যাবে৷ আর সুমি মরেও যেতো যদি না অতনুর ছোটো বোনের চোখে ভাগ্যক্রমে না পড়তো ..
আদালতে সুমি সব স্বীকার করে৷
বিয়ের পর দু বছর খুব ভালো ছিলাম আমি৷
প্রতি সপ্তাহে বিকাশ গ্রামে যেতো৷ মাঝে মাঝে যেতো না ৷ আস্তে আস্তে একদম বন্ধ করে দিলো৷ আমার টাকায় ব্যবসা খুললো৷ দুজনে চালাতাম ৷ পুরানো জিনিস কিনে আনতো বিকাশ৷ যা বিভিন্ন শোরুম আর পারসোনাল কাস্টমার কে বিক্রি করা হতো৷ খুব ভালো চলছিলো৷
বিকাশ মাঝে মাঝে বাড়িতে কাস্টমার আনতো যেটা আমার খুব অপছন্দের ছিলো৷ ওর সাথে অনেক অফিসে , হোটেলে গেছি৷ খুব খারাপ লাগতো একদল লোকের সামনে বিকাশের দেওয়া ব্যাকলেস পোশাক গুলো পড়তে , তবুও মেনে নিয়েছিলাম, পরে অভ্যাস ও হয়ে যায়৷ কিন্তু বাড়িতে লোক আনায় আমি অশান্তি শুরু করি৷ ব্যাস সেই থেকে দিন দিন বিকাশ কেমন যেন হয়ে গেলো৷ বাড়ি আসতো না, ফোন করলে ধরতো না৷ বাড়ি আসলে বলতো ,কিওরি সংগ্রহ করতে গিয়েছিলাম ৷
আমি চেয়েছিলাম আমার সংসার , আমার সন্তান৷ বিকাশ কেরল গিয়েছিলো, তিনমাস পর যখন ফেরে তখন আমি জানাই আমি মা হতে চলেছি ৷ তখন থেকে বিকাশ নিজের আসল রূপ দেখাতে শুরু করে৷ বাবার জমানো টাকা তখন তলানিতে৷ ব্যবসায় যে কি হচ্ছে আমাকে কিছু জানাতো না ৷ কিছু বললে বলতো তুমি যখন লোকজন পছন্দ করোনা তো মুখ বন্ধ রাখো৷ বাচ্ছার কথা শুনে আগে আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করে যে , ব্যবসায় লস হয়েছে৷ কি করে বাচ্চার দায়িত্ব নেবো , কিন্তু আমি প্রতিবাদ করলে, নোংরা অভিযোগ আনে, বাচ্চা নাকি ওর নয়৷
সুমিকে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখে শুভ্রা বুকে টেনে নেয় মেয়েকে৷ রাগে গা কাঁপতে থাকে৷
পরে আবার কেসের ডেট পেলে , সুমি শুরু করে, নিজের বাচ্চা কে হারানোর যন্ত্রণার কথা দিয়ে ৷
তবুও মন পায়নি আমি বিকাশের ৷ আমার সাথে থাকলেও বিকাশের মন ছিলো টাকার দিকে৷ আমাকে কে নিয়ে কিছুদিনের জন্য কেরল চলে যায় বিকাশ৷ সুন্দর পরিবেশে মনের সব ক্ষত ভুলে যাই আমি৷ সেখানে কিছুদিন আমাকে নিয়ে বিকাশ পুরো নরমাল বিভেব করে৷
বাড়ি ফিরেই ইমোশনাল অত্যাচার শুরু করে ফ্ল্যাট বিক্রির জন্য৷ কিন্তু বিকাশ জানতো না যে ফ্ল্যাট বিক্রির অধিকার আমার ছিলোনা৷ বিকাশের মাথা গরম হয়ে যায়৷
পরে বিকাশ হঠাৎ উঠাও হয়ে যায়৷ আমি ছমাস বিকাশের অপেক্ষা করি, নিজের অবশিষ্ট গয়না বিক্রি করে চালাতে থাকি৷ ছোটো ছোটো বাচ্চাদের টিউশনি পড়ানো শুরু করি বাধ্য হয়ে৷ পরে বিকাশের পুরানো অফিসে চলে যাই একদিন৷ সেখান থেকে জানতে পারি বিকাশের পুরানো ঠিকানা ৷
ভোরবেলা বেরিয়ে দুপুর নাগাদ পৌছে যাই রাণাঘাটে ৷ সেখান থেকে কুড়ি কিলোমিটার দুরে বকচড়ায় বিকাশের বাড়ি৷ সেখানে গিয়ে সব সত্য জানতে পারে আমি৷
বিকাশের বৌ ছেলে মা সব সেই বাড়িতে থাকে৷ তবে তাদের অবস্থা খুব একটা ভালো না৷ আরও অবাক হই বিকাশের বৌ আমার কথা সব জানে, সেটা জানতে পেরে৷
বিকাশের প্রথম বৌ মালতী সুমি কে বলে , বিকাশ বলেছে, সুমি বিকাশ কে ফাঁসিয়েছে৷ জেলের ভয় দেখিয়ে বিয়ে করেছে৷ আরও কত কি৷ সুমি কি বলবে ভেবে পায়না৷ মালতী কিন্তু সব বুঝতে পারে আমার মুখ দেখে৷ নিজের ঘরে নিয়ে বসায়, সব ঘটনা আমি মালতী কে বলি৷
ক্লান্ত শরীর টাকে টেনে নিজের ফ্ল্যাটে গিয়ে যখন আমি পৌছাই ৷ তখন আমার সব স্বপ্ন , সংসার সব ধুলোয় ৷ জেদের বসে শুধুমাত্র মায়ের সাথে জেদ করে নিজের জীবন নিয়ে খেলা করেছি৷ আজ মা কোথায়? মায়ের কাছে যাবার মুখ নেই , মা কোথায় আছে সেই খোঁজটুকু তো রাখিনি৷
প্রথম ভেবেছিলাম আমি পুলিসে যাবো৷ কিন্তু কি বলবো? আমাদের বিয়ে হয়েছিলো মন্দিরে৷ একজন উকিল বাড়ি এসে রেজিস্টারী করিয়েছিলো সেটাও ভুয়ো কি না জানিনা৷ আর কি বলবো? টাকা সব আমি চেক সই করেছি৷ হ্যাঁ ধোঁকা দেবার জন্য জেলে পোরা যায় , তারপর? মালতীর মুখটা ভেসে ওঠে সামনে৷ ছেলেটার কি হবে? নিজে সবার কাছে সবসময় বলে বেরিয়েছি বিকাশ ভালো আমার মা ডাইনি৷ আজ কোন মুখে বলবো৷ জেদের বসে পরীক্ষা অবধি দেইনি৷ কাজ করবো সেই যোগ্যতা নেই ৷ বিকাশ স্বপ্ন দেখিয়েছে আর আমি ভেসেছি সেই স্বপ্নে৷
মাস খানেক পর ঠিক করলাম আমার পুলিসে অন্তত জানানো উচিত ৷ কিছু্ না হোক অতনু আঙ্কেল কে জানাবো৷
সেদিন হট করে বিকাশ এসে উঠলো৷ রোগা হয়ে গেছে, চোখের তলায় কালি৷ মুখটা দেখে মায়া হলেও সামলে নিয়ে অনেক অশান্তি করেছিলাম ৷ বিকাশ ক্ষমা চেয়েছে ,কান্নায় ভেঙে পরে আমার কাছে ক্ষমা চেয়েছে ৷সেদিন সারারাত দুজন শুধু জেগে থেকে ভেবেছি কি হবে আর কি হবেনা৷ আমি ভেবেছি আমার কি করা উচিত ৷ সকালে বিকাশ বলে , সুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও ৷ আমার সাথে কেরল চলো, সেখানে জব পেয়েছি৷ আর কোন সমস্যা হবেনা৷ এই ফ্ল্যাট ভাড়া দিয়ে দেবো৷ তোমাকে আবার ভর্তি করে দেবো৷ আমি জানতে চাই তখন মালতীর কি হবে? বিকাশ বলে মালতীর সব খরচ বিকাশ দেবে৷ মালতী বিকাশ কে ডিভোর্স দিতে রাজী৷ আমি নিজে অতনু কাকুর কাছে গিয়ে দশ লক্ষ টাকা চেয়েছিলাম ৷ কাকু নিজের ফ্ল্যাট বিক্রি করে সেই টাকা আমাকে দেন৷ আর বলেন তিনি চলে যাচ্ছেন৷ আমি জানতাম কাকু মায়ের কাছে যাচ্ছেন৷ তাই কেরল যাবার আগে দেখা করে বলে এসেছিলাম , আমরা ভালো আছি৷কেরল যাচ্ছি ৷ কাকু দিয়েছিলেন যে টাকা , সেই টাকা আমি নিজে মালতী কে পাঠাই ৷ মালতীর জন্য তার ছেলের জন্য৷ মালতী নিজে আমার সামনে কাগজ সই করে চলে যায়৷
দুমাস কেরলে খুব ভালো ছিলাম ৷ বিকাশ রোজ অফিসে যেতো৷ বিকালে চলে আসতো৷ একটা সুন্দর ঘর ভাড়া নিয়েছিলাম৷ আমি নতুন ভাবে আবার পড়া শুরু করবো ভাবছিলাম ৷ সপ্তাহে সপ্তাহে গ্রামে ফোন করে কথা বলতাম দুজনে৷ আমিও ভাবতাম মা কে ফোন করি৷ কত ভালো আছি সেটা জানাই , কিন্তু সব যে মরীচিকা তখন জানতাম না৷
একদিন রাতে অসহ্য পেটের ব্যথা নিয়ে ভরতি হলাম হাসপাতালে৷ তারপর আর কিছু মনে নেই ৷
সাতদিন পর জানলাম আমার বড় অপারেশন হয়েছে৷ আর কোলকাতায় এসে জানলাম আমার কিডনি বাদ গেছে একটা৷
বাদ নয় ধর্মাবতার , সুমি দেবীর স্বামী সেটা বিক্রি করেছেন৷
অবজেকশান!!!
বিকালে অতনু কোর্টের সিঁড়ি দিয়ে ধরে ধরে নামাচ্ছিলো সুমিকে৷ আমি পিছনে হাঁটছি৷ গোধূলির আলো সারা আকাশে৷ দুই উকলের বাগবিতণ্ডা এবার চলবে৷ আসলে সুমির বোকামি আর অন্ধ ভালোবাসার জন্য্, বিকাশের সব দোষ গুলো প্রমাণ করা খুব কঠিন৷ কেস চলবে, হয়ত একদিন সাজা হবে৷ সাজা হবেই আমি জানি৷ কিন্তু আমি অনেককিছু হারিয়ে সুমি কে পেয়েছি৷ আমার যেন সব পাওয়া হয়ে গেছে৷ জীবনটা কত সহজ ভাবে কাটানো যায়৷ আমরা শুধু নিজের জেদে এটাকে জটিল করে ফেলি৷
আজ মনটা হালকা লাগছে, ঘরে ফিরেছে পরদেশী মেঘ৷
সমাপ্ত


2 Comments
অপূর্ব লিখেছ
ReplyDeleteখুব সুন্দর
ReplyDelete