সোমা কাজী



সত্যি যখন গল্প 

জানো বড় আন্টি, আমি না সব বাড়ি গুলোতেই ঠাকুর পেতেছি। এই বাড়িতেও।
ঘরে পা দেওয়া মাত্র যে দুজন লাফিয়ে উঠলো তাদের একজন বছর তেরোর আর একজন সদ্য দুমাস হ'ল দুই পেরিয়েছে।
        প্রায় বছরখানেক পরে চেন্নাই এল সুচরিতা। মেয়ের বাড়ি। আগে খুব ভালো লাগতো লোকজন নিয়ে  হৈচৈ করে কাটাতে। এখন কেমন একাকীত্বের নেশায় পেয়ে বসেছে তাকে। নতুন করে নিজেকে ভালো লাগছে ইদানীং। একটু একটু করে নিজের নতুন ঠিকানা সাজিয়ে গুছিয়ে তুলতে তুলতে কখন যে একলা থাকার আনন্দ তাকে মশগুল করে তুলেছে আগে থাকতে টের পায়নি সুচরিতা।
ব্যালকনির সবুজ পাতা মেলা. মানিপ্ল্যান্ট
 বা হাতে বোনা ফল রাখার পাটের টুকরি... এসবের গায়ে লেগে থাকা অদৃশ্য কোনো মায়া সুতোর টানে তার নিজের জায়গা ছেড়ে সহজে কোত্থাও যেতে চায়না সে।
 অফিস থেকে মেয়ে এসেছিল এয়ারপোর্টে নিতে। বাড়িতে এসে  মায়ের খাবার ব্যবস্থা করে ফেলল
 ঝটপট। নিজেও নাকে মুখে গুঁজে আবারও বেরিয়ে গেল অফিসে।
 সুচরিতা দরজা বন্ধ করে ফিরে এলো। রাবেয়া তাদের নতুন ফ্ল্যাটের চারদিক মহা উৎসাহে দেখাতে দেখাতে নিয়ে এল বাচ্চাদের খেলনা, ছবি আর বই দিয়ে সাজানো ঘরটায়।
ভারী সুন্দর একটা আলমারি আছে সেই ঘরে। পাল্লা দুটোয় কিছু দূর অন্তর অন্তর ঘন্টার নকশায় জাফরি কাটা। সেই জাফরিতে একটা করে ছোট ঘন্টা লাগানো। পাল্লার মাঝখানে আয়তাকার সরু কাচ লাগানো যা দিয়ে আলমারির ভেতর  পর্যন্ত দেখা যায়।
বড়ো মেয়ে রাবেয়াকে তার মা পাঠিয়েছিল সুদূর মুর্শিদাবাদের এক অজ গ্রাম থেকে। চার চারটে মেয়ে... তার উপরে কালো, ভবিষ্যতের কথা ভেবেই হয়ত! রাবেয়া যখন চেন্নাই এ আসে মধুবনী তখন নয় কি দশ মাসের। বাড়ি, পরিচিত গণ্ডী ছাড়িয়ে বনুু আর আন্টি আংকেলই তার সবকিছু হয়ে গেছে। কেউ বোঝেওনা যে ওরা দু'বোন নয়। বাচ্চা খেলাতে এসে মেয়েটা তার কাকুু কাকিমার প্রথম বাচ্চা হয়ে গেছে কখন!
সুচরিতার মেয়ের অফিসের ব্রাঞ্চ চেঞ্জ হয় মাঝে মাঝেই। সেই মতো ওকেও বাড়ি পাল্টাতে হয়। চেন্নাইয়ের রেন্ট হাউস গুলো তুলনায় কোলকাতা শহরের থেকে অনেক উন্নত বলে মনে হয়েছে সুচরিতার। একটা মানুষের সাধারণ অসুবিধেগুলো বাড়ির মালিকরা মাথায় রাখেন। তার সঙ্গে ঐ মন্দির! আস্তিক -নাস্তিক বিতর্কের বাইরে গিয়েও বলা যায় যে এগুলো গৃহসজ্জা হিসেবে মন টানবেই।

বিশ্রাম করতে করতে সন্ধে হয়ে এল। সুচরিতা কাপড় পাল্টে ধূপ জ্বালিয়ে মন্দিরের দরজা খুলে ঠাকুর প্রণাম করল। পিছু পিছু বিচ্ছু দুটো। সুচরিতা দেখল দুহাত জড়ো করে রাবেয়া চোখ বন্ধ অবস্থায় বিড়বিড় করছে কিছু। খুদেটা চোখ পিটপিট করে দেখছে ওকে আর কিছু বলছে নিজের মনে।
 চন্দন ধূপের গন্ধে কেমন একটা নিবেদনের পরিবেশ ঘরের ভেতর। তুই ঠাকুর প্রণাম করিস রাবেয়া!! নামাজ পড়িসনা? একচিলতে হাসল রাবেয়া - আরে ঠাকুরকেই আমি বলি হে আল্লাহ! সবাইকে ভালো রাখো। আপনাদের ঠাকুর আর আমাদের আল্লাহ একই তো গো!
ওর বনুকে জিজ্ঞেস করল সুচরিতা, কি বল্লে বাবু তুমি ঠাকুরকে?  আধো আধো উচ্চারনে সে বল্ল -আল্লা গুড নাইট!! সে বোঝেনা তার নাম মধুবনী সেন!

সুচরিতা মরমে মরে গিয়ে ভাবল, আমরা কবে ওদের মতো করে ভাবতে শিখবো!!


Post a Comment

2 Comments