জয়ন্ত অধিকারি


লাল গোলাপ
জয়ন্ত অধিকারি

অফিস শেষে ক্লান্ত পারমিতা হেঁটে বাড়ি ফিরছে। আজ খুব দেরি হয়ে গেছে। এমনিতে বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধে সাতটা হয়েই যায়। আর আজ, মাসের শেষ দিন। অডিট হচ্ছিলো। সব বুঝিয়ে, বেরোতে বেরোতে সাড়ে দশটা হয়ে গেছে। 

তারপরেও বিপত্তি ! হঠাৎ করেই বজ্রবিদ্যুৎ আকাশে, আর তার সাথে হুড়মুড় করে নামলো বৃষ্টি। প্রায় মিনিট চল্লিশ পরে পাওয়া গেলো গাড়ি। রাত সাড়ে বারোটার সময়ে গাড়ি গলির মুখে নামিয়ে দেয় পারমিতাকে। 

সরু গলিটা দিয়ে আরো মিনিট দশেক এগিয়ে গেলেই পারমিতার বাড়ি। কিছুক্ষনের বৃষ্টিতেই জায়গায় জায়গায় জল জমে গেছে। গলির ভাঙাচোরা গর্তগুলো জলে ভাসছে এখন। অসতর্ক হলেই পড়ে পা ভাঙবে। 

পারমিতা গর্তগুলো পাশে রেখে এগোতে থাকে বাড়ির দিকে তাড়াতাড়ি। কয়েক পা এগোনোর পরেই হঠাৎ মনে হলো কেউ যেন পিছু নিয়েছে। দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক, পেছনে তাকায় ও। কেউ কোথাও নেই। এতো বছর ধরে এই গলিতে যাওয়া আসা করছে ও, কখনো এরকম ভাবে ভয় পায় নি। 

পারমিতা শুরু করলো দৌড়োতে । ওই তো ! সন্ধ্যাকাকীর চায়ের দোকান  ; মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই পৌঁছে যাবো বাড়ি ! ভয়ে ঘামতে থাকে পারমিতা। আশেপাশের সব বাড়ি অন্ধকার। টিপটিপ করে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো আবার এসে পড়ে ওর ওপরে। সামনে থেকে আসছে দোদুল্যমান এক আলোর রেখা ! 

পারমিতা চেঁচিয়ে বললো, "শুনছেন ? আমাকে একটু সাহায্য করবেন ? মনে হচ্ছে কেউ আমার পেছনে তাড়া করছে ! "

সামনে থেকে চারজন মানুষ হঠাৎ করেই চলে এলো পারমিতার সামনে। সবার মুখেই প্রচন্ড মদের গন্ধ! একজন বলে উঠলো ; "কি ? কি বলছেন দিদিভাই ? তাড়া করছে আপনাকে ? এখানে তো আমরা ছাড়া…! " 

পেছন থেকে একজন বলে ওঠে, "আরররররে, এটা তো সেই মালটা রে ! ওই যে, কয়েকদিন আগে ওর বরটা...আহারে ! একা একা খুব কষ্ট ? আজ আবার বৃষ্টির দিন। বাজ পড়ছে। কোথায় প্রেম করবে, ঘষাঘষি করবে ! শালা  মালটাই ফুটে গেলো ! তাআআ…এই একদুইতিনচার; চার চারজন , কি গো সোনামনি, হবে নাকি ? সসশালা দেখেছিস , কেমন রাত করে ফিরেছে ? নিশ্চয়ই কারোর সাথে..."

সামনের ছেলেটি অশ্লীল ইঙ্গিত করে পারমিতার কাঁধে হাত দিলো হাসতে হাসতে ! 

আরো একটা ছেলে পারমিতার মুখের কাছে নিজের মুখ নিয়ে এসে বললো, "একা একা থাকে ? আরে বাহ, আজ এই বৃষ্টি বাদলার রাতে একা একা কেউ কি থাকে গো ? কে আবার তোমার পেছনে তাড়া করেছে ! না না, তোমাকে তো একা ছাড়া যায় না ! কি বলিস তোরা ! "

সবাই সমস্বরে বলে উঠলো, "ঠিক ঠিক !!! "

পারমিতা চেঁচিয়ে উঠলো, "এই , কেউ কেউ এগোবে না , শয়তান, কুকুরের দল ! " 

দৌড়োতে শুরু করলো পারমিতা। ওর পেছনে বাকি সবাই দৌড়োতে গিয়ে হঠাৎ থমকে গেলো এক বীভৎস আতঙ্কে। 

পারমিতা বাড়ির দিকে দৌড়োতে দৌড়োতে পেলো শুধু গর্জনের আওয়াজ। বাড়ির গেটের কাছে এসে পারমিতা পেছনে ঘুরে  মোবাইল বের করে হান্ড্রেড ডায়াল করতে যায় ! পেছনে তো কেউ নেই কোথাও ! কি হোলো ? এএএএটা কি স্বপ্ন ? মনের ভুল ? 

তাড়াতাড়ি করে গেট খুলে ভেতরে ঢুকতে যায় পারমিতা। আবার সেই খসখস শব্দ ! কিছু বুঝে ওঠার আগেই, হঠাৎ কে যেন পারমিতার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়লো , পারমিতা পড়ে গেলো মাটিতে ! চিৎকার করে উঠলো আতঙ্কে ও। 

জিভ বের করে গালের ওপরে চেটে , চার পা বুকের ওপরে তুলে আট মাসের ভুলু - জুলজুল চোখে তাকিয়ে পারমিতার মুখের দিকে ! মুখে কুঁই কুঁই আওয়াজ, লেজ নড়ছে ! পাশে দাঁড়িয়ে আরো চারটে কুকুর । পারমিতা চোখ খুলে ভুলুকে দেখে আনন্দে জড়িয়ে ধরলো। 

তাহলে এদেরকে দেখেই পালিয়ে গেলো ওরা ?  

প্রতিদিন সকালে অফিসে যাওয়ার সময় বাসে ওঠার আগে, পারমিতা এদের সবাইকে নিজে হাতে খাইয়ে দেয়। চারপেয়েগুলোর ভালোবাসায়, কৃতজ্ঞতাবোধে চোখে জল চলে এলো পারমিতার। উঠে দাঁড়ালো পারমিতা , কুকুরগুলো জন্য ভেতর থেকে বিস্কুট, সকালের বেঁচে যাওয়া কিছু রুটি এনে ওদের খেতে দিয়ে গলির দিকে তাকালো। 

পেছনে ঘনীভূত হচ্ছিলো ঘন গাঢ় এক কুয়াশার মতো অন্ধকার। কুকুরগুলোর খাওয়া শেষ হলে, মিলিয়ে গেলো সেটা। কুকুরগুলো দৌড়ে চলে গেলো বাইরের দিকে !

ঘরের ভেতরে এলো পারমিতা। গেট বন্ধ করে ফ্যান ছেড়ে জল খেয়ে বসে পড়লো ও। টেবিলের ওপরে শুভেন্দুর হাসি মাখা ফটো ; রেগে ফটোটা টেবিলের ওপরে উল্টে চেঁচিয়ে উঠলো পারমিতা,"সব তোমার জন্য হয়েছে , সব কিছুর জন্য তুমিই দায়ী।"

কাঁদতে কাঁদতে বাথরুমে ঢোকে পারমিতা। 

ওই নোংরা ছেলেগুলো আমার গায়ে, আমার শরীরে হাত দিয়েছিলো। সব ধুয়ে সাফ করতে হবে ! কেন, শুভেন্দু ? যদি চলেই যাবে, তাহলে এসেছিলে কেন ? 

স্নান সেরে বাইরে বেরিয়ে আসে পারমিতা। খিদে পেয়েছে খুব। ফ্রিজ খুলে দেখে সকালের ডাল আর ভাত পড়ে আছে, আর আছে বেলজিয়ান চকলেট। এই চকলেটগুলো দিন পনেরো আগে শুভেন্দু এনেছিল পারমিতার জন্য, পারমিতার জন্মদিন উপলক্ষে। সে চকলেট আর খাওয়া হয় নি। 

বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লো চকলেটের প্যাকেট নিয়ে। দেয়ালে বড়ো করে শুভেন্দু আর পারমিতার ফটো , দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে।  

চোখের কোণ ভিজে উঠলো পারমিতার।    

++++++++++

শুভেন্দু আর পারমিতার বিয়ে হয়েছিল মাস ছয়েক। বিয়ের মাস তিনেকের মধ্যে হঠাৎ করেই ধরা পড়ে শুভেন্দুর রক্তে বাসা বেঁধেছে মারণরোগ। ভীষণ ভেঙে পড়েছিল দুজনেই সেই দিন। তবুও হেরে যাওয়া লড়াইটা চালিয়ে গেলো দুজনে একসাথে। 

শেষ কয়েকদিন কি ভয়ঙ্কর ছিল, ব্যথা - যন্ত্রনায় কাতর শুভেন্দু বারবার পারমিতাকে বলছিলো, "এর থেকে আমার চলে যাওয়া ভালো, তুমি আর আমার চিকিৎসার পেছনে খরচ কোরো না। তোমাকেও তো বেঁচে থাকতে হবে ! " 

"চুপ চুপ শুভ, একদম এসব কথা বলবে না। দয়া করো , একটু থামো। "

"যেটা হবে, সেটা তুমি জানো , আমিও। মুক্তি নেই, পারমিতা। আমি , আমি শুধু তোমাকে খুশি, সুখী দেখতে চাই। তুমি, তুমি কথা দাও, আবার নতুন করে জীবন শুরু করবে। আবার তুমি কাউকে বিয়ে কোরো পারমিতা। আমার স্মৃতি আঁকড়ে পড়ে থেকো না। আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে পারো - তোমার সাথে আমি আরো কিছুদিন একসাথে থাকতে পারলাম না , পারলাম না তোমাকে ভালোবাসতে !" 

শুভেন্দুর হাত ধরে পারমিতা বলেছিলো , "আমার আর কারোর ভালোবাসা দরকার নেই। তুমি আমাকে এই কয়দিনে যা দিয়েছো, আমাকে এতো ভালোবাসায় রেখেছিলে , কেউ সেভাবে আমাকে রাখতে পারবে না শুভ। " 

শুভেন্দু ওর হাতে চকলেটগুলোর প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে বললো ,"আমার একটা অনুরোধ রাখবে ? এই, এই চকলেটগুলো তোমার জন্য, তোমার জন্মদিনের জন্য। আমি হয়তো আর তখন থাকবো না , কিন্তু তুমি খেয়ো , আমি শান্তি পাবো। "

++++++++++

এতদিন পরে সেই চকলেটের প্যাকেট হাতে নিয়ে বিছানায় বসার পরে , সব যেন ভেসে উঠলো চোখের সামনে। প্যাকেটটা খুলতেই ভেতর থেকে একটা কাগজ বেরিয়ে এসে পড়লো পারমিতার কোলের ওপরে। 

"পারমিতা - আমার যে কি কষ্ট হচ্ছে তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। না না, এই রোগের জন্য না, কিন্তু তোমার সাথে আর আমি থাকতে পারবো না, কাটাতে পারবো না সারা জীবন তোমার সাথে, দেখতে পাবো না আমাদের সন্তানকে কখনো - সেই মানসিক যন্ত্রনায় আমি শেষ হয়ে যাচ্ছি। তবে তুমি, তুমি কিন্তু আমার কথা ভেবে আবার সব ছেড়ে সারাক্ষন ধরে কান্নাকাটি করবে না ! কাঁদলে তোমাকে দেখতে ঠিক ওরাংওটাং এর মতো লাগে। তুমি সবসময় খুশিতে থাকবে, ভালো থাকবে , এটাই আমি চাই। আমি সারাক্ষন আমার পারমিতার কাছে না থাকলেও আমি, সবসময় তোমার আশেপাশেই থাকবো ! আমি তোমাকে সবরকম বিপদ থেকে রক্ষা করবো পারমিতা, তোমার গায়ে আমি কোনো আঁচড় লাগতে দেব না ! প্রমিস !" 

পারমিতা চিঠিটা পড়ে কাঁদতে কাঁদতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়লো ! ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে পারমিতা দেখলো - 
ওদের বাড়ির সামনের সেই চেনা পরিচিত গলি ধরে হেঁটে যাচ্ছে  একটা ছায়া। তার চারদিকে ঘন ধোঁয়া , কুয়াশার মতো আবরণ ! একটু দূরে গিয়ে রাস্তার কুকুরগুলোর কাছে বসে ওদেরকে আদর করছে সেই ছায়ামানব। পারমিতা দূর থেকে হেঁটে আসছে , ভুলুকে দেখতে পেয়েছে পারমিতা। ও ডেকে উঠলো, ভুলু, যায় আমার কাছে। ভুলু ছায়ামানবের দিকে তাকিয়ে, ছোট্ট ছোট্ট চার পায়ে দৌড়ে আসছে পারমিতার দিকে। পারমিতা আরো একটু এগিয়ে গেলো দেখার জন্য ছায়ামানবকে। ছায়ামানব চোখতুলে তাকালো ঘন ধোঁয়ার মধ্যে থেকে। আরে , এ তো , শুভ, আমার শুভেন্দু। শুভ , শুভ করে চেঁচিয়ে উঠলো পারমিতা , দৌড়ে গেলো ছায়ামানবের দিকে। 

ঘুম ভেঙে গেলো পারমিতার। সকাল হয়ে গেছে , স্নান সেরে অফিসের জন্য তৈরী হয়ে বেরোলো পারমিতা। কুকুরগুলোকে ডেকে ওদের খাইয়ে এগোলো পারমিতা। গলির মুখে বেশ ভিড় , কেউ গতকাল রাতে কয়েকটা মাতালকে ধরে খুব পিটিয়েছে। ওরা নাম বলতে পারছে না , বার বার বলছে ধোঁয়া , কুয়াশায় ঢাকা একজন এসেছিলো, তারপরে ওদের কিছুই মনে নেই! 

পারমিতা এগিয়ে গেলো ওদের ছেড়ে। শুভ কোথাও যায় নি, আমার সাথেই আছে, সবসময়। আকাশের দিকে তাকিয়ে পারমিতা বলে উঠলো," শুভ, আমার সাথেই থাকবে তো সারাজীবন ? আমাকে এভাবেই ভালোবেসে যাবে তো ?" 

কুঁই কুঁই শব্দে পারমিতা তাকায় পায়ের দিকে , ভুলু একটা লাল গোলাপ মুখে করে এনে ওর পায়ের সামনে দাঁড়িয়ে - দুপায়ে ভর দিয়ে  .....

সমাপ্ত

Post a Comment

3 Comments

  1. এক রাশ মুগ্ধতা
    অসামান্য লেখা

    ReplyDelete
  2. ভীষণ ভীষণ মন ছোঁয়া ভালো লাগলো

    ReplyDelete