দেবপ্রসাদ বসু




ছেঁড়া পাতা
দেবপ্রসাদ বসু



          অনেক সময় রাস্তা ঘাটে মাঠে ময়দানে অনেক কিছু এমন চিত্র দেখা যায় যা অবিশ্বাস্য অকৃত্রিম, স্মৃতির পটে বাঁধিয়ে রাখার মতো। কিন্তু তার কিছু অনেকদিন ধরে দেখা যায়, কিছু ক্ষনিকের বা মুহূর্তের জন্য দৃশ্যমান। একমাত্র পথ ছবির মুঠোয় বন্দি করা। যেগুলো অনেকদিন ধরে থাকে বা দেখা যায় তারও আবার কিছুদিন অন্তর রূপ পাল্টায়। কিছু আবার অনন্তকাল ধরে দেখা গেলেও তা এমন দূরবর্তী স্থানে অবস্থিত তা সব সময় নাগালে থাকে না, ভ্রমণে যার সাক্ষাৎ মেলে।
          সেদিন, অনেক বছর আগের কথা, তা প্রায় দু-আড়াই বা তিন দশক আগের কথা হবে। শিয়ালদা, যার প্রকৃত নাম শিয়ালদহ হবে, তবে বহু যুগ ধ'রে বহু মুখে উচ্চারণের দ্বারা ব্যবহৃত হতে হতে ক্ষয়ে ক্ষয়ে দহ টা দা হয়ে গেছে সময়ের জীবন্ত কম্পিউটারে।  তথাকথিত শিয়ালদহ থেকে বউবাজার স্ট্রিট ধ'রে পুরাতন ডালহৌসি বা নতুন নাম বি বা দি বাগ বা  বিনয় বাদল দীনেশ বাগের দিকে হাঁটছি। এখানেও সেই একই কথা, বহুবাজার স্ট্রিট লোকমুখে জিভের চাঁটি খেতে খেতে বৌবাজার স্ট্রিট হয়ে গেছে। যা হোক, যাচ্ছি, যাচ্ছি, ঠিক কলেজ স্ট্রিট বৌবাজার স্ট্রিট মোড়টা পেরিয়েছি অমনি থমকে গেলাম একটি মর্মান্তিক দৃশ্যায়নে। অনেকেই জানেন, অনেকেই জানেন না, যাঁরা জানেননা তাঁদের বলে রাখি, এই দীর্ঘ বৌবাজার স্ট্রিটকে মাঝে মাঝেই কেটে দিয়েছে বা সংযোগকারী রাস্তা হিসেবে মিলিত হয়েছে সহযোগী রাস্তা হিসেবে জনতার সেবায় ও সাহায্যে তারা হল, প্রথমে আমহারস্ট্রিট, যা ওই আগের মতোই কুঁচকে গিয়ে আমাস্ট্রিট হয়ে গিয়েছে। দ্বিতীয়, কলেজ স্ট্রিট শুরু ডানদিকে, বামদিকে নির্মল চন্দ্র স্ট্রিট, কিছু দূর গিয়ে পুরাতন সেন্ট্রাল এভিনিউ এবং অধুনা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন এভিনিউ। তারপর বেনট্রিক স্ট্রিট। সেটারও নতুন নাম হয়েছে ঠিক এই মুহূর্তে মনে নেই। এই নাম পরিবর্তন গুলো যেন সময়ের, সভ্যতার পোশাক বদলানোর মতো।
        যাহোক, কাজের কথায় আসি। পাঠকেরও তো অপেক্ষার একটা সীমা আছে। তারও তো ক্রোধ ব'লে কিছু একটা বস্তু আছে। তা সবেমাত্র বৌবাজার মোড় ক্রস করেছি, ওই যা: ভুল হয়ে গেল আবার, যায়ও বারবার, সময়ের দাস হয়ে, চারদিকে যে হারে বাংলায় ইংরাজি মিশিয়ে বাংরেজিতে কথা চালাচালি চলছে তাতে প্রভাবিত হয়ে পড়ি বারবার। ক্রস নয় পার করেছি এমন সময় দেখি, এক ঠাকুমা গোছের বয়স, আন্দাজ পঁচাত্তর আশপাশ হবে হয়তো, কিংবা হয়তো দারিদ্র্য জনিত দুঃখ কষ্টে বয়স নিজেই চেনা দিতে চাইছে না। এরকমও হয় বলেই বলছি। আর একটা কথা, তখন পৌষমাস, দীর্ঘ শীতের সময় বা শীতের রাজত্ব। কলকাতা শহরে শীত তেমন একটা আধিপত্য দেখাতে পারেনা যদিও দূষণ, জনবহুলতা ও অট্টালিকার ঘনত্বের কারণে তবুও প্রতি বছর অন্তত দশ বারো দিন জোরসে কামড়ে রাখে পাহাড়ে বরফ পড়ার প্রতিক্রিয়ায় একটু সুযোগ পেলেই দক্ষিণে সাগরের হাওয়ার দাপট একটু কমলেই সেই অবসরে। নচেৎ তো দুই মেরুর বা প্রান্তের উষ্ণ শীতল বাতাসের সম শক্তির যুদ্ধে প্রায়শই পরিণতি হিসেবে কুয়াশার জন্ম হয়ে গরম আধিপত্য দেখাবার চেষ্টা করে। এ জগতে বা দুনিয়ায় বা মানব সভ্যতায় বা সবক্ষেত্রেই কেউ কাউকে ছেড়ে কথা বলে না। বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সুচাগ্র মেদিনী। সে, কথা হোক, চিন্তা হোক, ক্যারিশমা হোক, জড় বা জীবন্ত যা ই হোকনা কেন।
          তা ফিরে আসি সেই তথাকথিত সামাজিক ঠাকুমার কথায়। কনকনে শীতে বড় চারফুটে মোটা একটা চিনির বস্তা, এখনকার ছেলেপুলেরা বা মানুষজনের যা না দেখবারই কথা। এখন তো প্লাস্টিকযুগ। এখন সবতাতেই প্লাস্টিক। সকালে টুথব্রাশ থেকে রাত্রির মাথার চিরুনিটা অবধি। কিসে নেই প্লাস্টিক। জলের যগ, মগ, বালতি, গামলা, থালা, বাটি, টুল, টেবিল, এমনকি ডাইনিং টেবিল, চেয়ার আরও কত কি --- সব বলতে গেলে প্লাস্টিক নিয়েই একটা বড় গল্প বা উপন্যাসের জন্ম হয়ে যেতে পারে। যাহোক, ঠাকুমা, ব্যক্তি পরিবারের ঠাকুমা এখন সামাজিক ঠাকুমা বনে গিয়েছেন। সেই দুরন্ত নয়-দশ ডিগ্রি ঠান্ডায় কোনোরকমে সেই বস্তাটার মধ্যে কুঁকড়ে মুকরে ঢুকে শুয়ে আছেন মাত্র নাকটুকু বার ক'রে কেবলমাত্র বিনিপয়সায় পাওয়া নিঃশ্বাসের বাতাসটুকুর দাবি রেখে। যদিও তা দূষণ জর্জরিত। যদিও বা অত দিন আগে দূষণের মাত্রা এত প্রকট ছিল না। প্রথমে মনে হলো, বোধহয় মৃত। তারপর খানিকক্ষন দাঁড়িয়ে থেকে বুঝলাম, না জীবিত। হয়ত তিনি নন প্রাণই তাঁকে আঁকড়ে রেখেছে। দয়া করেছে না আরও বিড়ম্বিত জীবনের স্বাদ পাইয়ে দেওয়ার জন্য তা সময়ই জানে, জানে কালের ইতিহাস।
          কি করার আছে আমার তা ভাবতে থাকলাম। না কিছুই করার নেই তেমন। সবাই অফিস টাইমে বা সময়ে ভীষণ ভীষণ ব্যস্ত। চাকরি মানে চাকরের জীবন। বসের ধমক, ছুটি থাকলে ছুটি, না থাকলে মাইনে কেটে নেওয়াটা তারা দায়িত্বের সাথে যথাযথ পালন করে যতটা না মাইনে বাড়াবার আর্জিতে করে। এর নাম অসংগঠিত দাসত্বের জীবন। মনে হলো, আমি যদি সাংবাদিক হতাম, ছবি তুলে দু-কলম লিখে খবরের কাগজের পাতায় ছাপিয়ে প্রচার ক'রে দিতাম সামাজিক স্বাস্থ্যের কথা ব'লে। নিদেনপক্ষে আমার নিজের যদি একটা পকেট ক্যামেরা থাকত তা হলেও হত।
          যুগের সাথে সাথে সময়ের সাথে সাথে সমাজ ব্যবস্থা মানুষের হাব ভাব চালচলন জীবন যাপন সব পাল্টায়। আজকের সময়ে উন্নত প্রযুক্তির দৌলতে একটা ক্যামেরা কবলিত মোবাইল ফোন হয়ত থাকত হাতে যার সাহায্যে দাম কম বেশি অনুযায়ী একটা যেমন তেমন ছবিও হয়তো তুলে রাখতে পারতাম, হয়তো কোনও একটা লিটিল ম্যাগাজিনে ছাপাতে পারতাম বড় কিছু সমাজ বৈপ্লবিক দুর্ঘটনা ঘটাতে না পারলেও অন্তত একটু ঘুম না ভাঙাতে পারলেও সামান্য সুড়সুড়িও হয়তো দিতে পারতাম। দুঃখ নিয়ে, যা নেওয়া অত্যন্ত সহজ, পথ চলতি অন্যান্য মানুষজনের মতো আমিও ধীরলয়ে আমার গন্তব্য রুটি-রুজির আস্তাবলের দিকে ধাবিত হলাম দ্বিপদী প্রাণীর মতো।
          এর কিছুদিন পর গিয়েছি বেড়াতে বন্ধুর মাসির বাড়ি শহর থেকে কিছটাু দূরে, শহরতলি যাকে বলে। সেখানে কথায় কথায় গল্পে গল্পে জানতে পারলাম, সেই পাড়ার এক গৃহবধূ নয়, গৃহশ্বাশুড়িকে বাড়ি থেকে বার করে দিয়েছিল একটি পরিবার মধ্যরাতে কিছুটা মারধর ক'রে। মধ্যরাত ব'লে সবাই না হলেও কেউ কেউ সে ঘটনা জানতে পেরেছিল। ভুতের গল্পের মতো কানাঘুঁষোয় সেকথা পাড়ার বাতাসে ফিসফিসিয়ে চলাফেরা করে গোপনে। কেননা, পরিবারটির পয়সা অনেক, এবং সে দৌলতে রাজনৈতিক প্রতিপত্তিও বিস্তর। অভিমানী সেই তিনি নাকি আর বাড়ি ফেরেননি। শহরের রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষে ক'রে কাটাতেন। তিনি নাকি বুঝতে পেরেছিলেন, বাড়ি ফিরলে তাঁকে হয়তো গোপন খুন হয়ে যেতে হতে পারে। এমন আশঙ্খার কথা তিনি নাকি কাউকে কাউকে সুযোগমতো বলেওছিলেন প্রমানহীন এমন দাবিও করে কেউ কেউ। এমনিতে তো মারধর চলত নিত্য, প্রায়ই। বৌমা শ্বাশুড়ির উত্তপ্ত কথা বিনিময় চলত বেশ কিছু বছর। তারপর শুধুই বৌমার গলা শোনা যেত। মাঝে মাঝে মারধরের আওয়াজ। পাড়ার লোকেরা বলতে গেলে বা প্রতিবাদ করতে গেলে অপমানিত হতো। বৃদ্ধ বিধবা মহিলা আর্থিক নিস্ব ছিলেন। স্বামীর ভিটেটুকুতেও তাঁর অধিকার ছিলোনা। তার ওপর ক্রমশঃ বার্ধক্যের ফাঁস চেপে বসছিল শরীরে।  বিষয়টি নারীর প্রতি নারীর অত্যাচার না মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব পালনে অক্ষমতা তা বলবার জো নেই। কেননা, বিষয় উপস্থিত হলেই সমাজ বুঝুক না বুঝুক দুই দলে ভাগ হয়ে যায়। বক্তা বা বক্তব্য দড়ি টানাটানির হয়ে যায় বস্তু। হটাৎ বন্ধুর সেদিনের কাথাটা মনে  পড়লো, কথা মানে কটি প্রশ্ন --- ঠাকুমার রং ফর্সা? মুখটা গোলমতো? বাঁ নাকের পাশে একটা তিল আছে?  মনে হলো, এই সেই ঠাকুমা নয় তো সেদিনের দেখা! নারীমুক্তির অন্তরায় নারীই নয়তো!
          ওমা! ঠিক এমন সময় বন্ধুর মাসির নাতি একটা খবরের কাগজের টুকরো এনে আমাকে বলল, দেখতো কাকু, এই ঠাকুমা কিনা! আমায় খুব ভালোবাসতো। লজেন্স দিত, আদর করতো। আমিও হামি দিতাম। আমাকে বলতো, আমার ছেলে হবি? নাতি হবি। বললাম, এ ছবি তুমি কোথায় পেলে? "ও" বললো, কাগজে বেরিয়েছিল, আমি কেটে রেখেছিলাম। আমার চেনা ঠাকুমা তো?অবাক হয়ে গেলাম। কথা বন্ধ হয়ে গেলো আমার। মনে হলো, গোলাপ তার নিজের কাঁটায় বিদ্ধ আজ।

Post a Comment

1 Comments