অতি চালাকের গলায় দড়ি
বিপশ্চিৎ পাত্র
(ষষ্ঠ শ্রেণি )
সেদিন রাতে টি.ভি দেখছিলাম ৷ হঠাৎ একটা অপরিচিত নাম্বারে ফোন এল । ফোনটা ধরলাম । ফোনটা ধরতেই ওপার থেকে কে যেন হুমকি দিয়ে বলল , "হুঁম, মিস্টার অতনু , সি.আই.ডি অফিসার ৷ সাবধানে থাকবেন ৷ কারণ আর মাত্র চারদিন পর তুই কাঁদতে কাঁদতে বলবি... ওহো ! সরি,সরি, অাপনি বলবেন , -দাদু চোখ খোলো , কিন্তু দাদু আর কোনদিন চোখ খুলবে না ৷" ফোনটা কেটে দিল ৷ ভয় কিছুটা হল , তবুও সাহস রাখলাম ৷ পরের দিন কিচ্ছু হল না । তার পরের দিনও না ।
তবে চতুর্থ দিনে একটা বড়ো ঘটনা ঘটে গেল ৷ তার কথা মতোই দাদু পৃথিবী ছেড়ে চলে গেল । রাতের বেলায় খুন ৷ তার ছাতির দুদিকে দু'টো ও ঠিক কপালে আরেকটা গুলির ছাপ পাওয়া গেল । তার পরের দিন রাতে আবার ঐ নাম্বার থেকে ফোন এল । ঐ লোকটা আমাকে জানাল , এরপর আমার বাবা তার টার্গেট ৷ তার ফোন করার ঠিক চারদিন পর বাবাও আমায় ছেড়ে চলে গেল । আমি পরের দিন অফিসে গিয়ে , ওই ফোন নাম্বারটা কার ,ওর নাম কী ,- এই সব তথ্য খুঁজে বার করলাম । শুধু ওই লোকটার একটা ছবি সংগ্রহ করতে পারলাম না ।
নিজেরই নিজের ওপর রাগ হল । মনে মনে ভাবলাম ,এত চেষ্টা করেও সব তথ্য জোগাড় করতে পারলাম না ! আমায় চিন্তিত দেখে আমাদের স্টাফ অপর্ণা আমায় বলল , "স্যার , কী হয়েছে ? আমায় বলুন ৷" আমি ওকে সব বললাম । আমাদের সবার থেকে ভালো হ্যাকার অপর্ণাই । কম্পিউটারের বিষয়ে ওর জ্ঞান অনেকটাই বেশি । ও একটু ভেবে কম্পিউটারে একঝলকে তার ছবিটা বের করে আমায় দিল ।
আমি খুব খুশি হলাম । আমাদের মধ্যে কিছুজন এই ব্যাপারটা জেনে গেছে । আমি তার খোঁজে বেরোব শুনে তারাও চলে এল । আমি বাধা দিলাম না । মাইকেল বলল ,"আচ্ছা স্যার ,ওর নেক্সট টার্গেট কে ?" আমি হেসে বললাম ,"কে আবার , আমি !" প্রথমে কেউ বিশ্বাস না করলেও পরে বুঝিয়ে বলতে ব্যাপারটা সবাই বুঝতে পারলো ৷ কয়েক ঘন্টার মধ্যে আমরা সেখানে পৌঁছে গেলাম I দেখলাম , একটা ভাঙা ঘর একা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে ।
ঘরের ভেতর ঢুকলাম । পেছন থেকে একটা আওয়াজ ভেসে এল । পেছন ঘুরে দেখলাম , তারপর ! ... তারপর যে শরীরে কতক্ষণ জ্ঞান ছিল না , জানি না ৷ জ্ঞান আসতেই চোখ খুলে দেখি ,একটা মুখোশপরা লোক আমাদের সবার হাত-পা শক্ত করে বেঁধে দিচ্ছে ৷ আমি চিৎকার করে বললাম ,"এসব কী হচ্ছে ?" ঝট্ করে উত্তর ফিরে এল ,"আগে টরচার ,তারপর মার্ডার ।" লোকটা পকেট থেকে একটা ছুঁচের ব্যাগ বের করে আমাকে বলল ,"জানো ,আমি তোমাকে কেন শেষ করতে চাই ?" আমি গম্ভীর হয়ে বললাম , "কেন ?" সে পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে বলল , "আমাকে যখন দীপুকাকু আর কাকিমা আমেরিকাতে পড়তে পাঠিয়েছিল , তখন আমি বেশ বড়ো হয়ে গেছি ৷
ওরা কেন আমাকে আমেরিকা পাঠিয়েছিল জানো ? যাতে আমার বাবা-মাকে মেরে সব সম্পত্তি ওরা নিয়ে নিতে পারে ,আর ঠিক তাই করল !" দীপ্তেশ রায় আমার সেজ জেঠু ৷ এবার বুঝতে পারলাম এ আমাদের মেজো জেঠুর ছেলে ৷ বাবার মুখে এর সম্পর্কে সামান্য কিছু জানলেও একে কোনদিন দেখি নি । আমাদের সাথে কোন যোগাযোগও ছিল না । আমি বললাম ,"তাহলে তুমি আমার বাবাকে মারলে কেন ?" উত্তর এল- "দীপু কাকু তো তোমারই বাবার দাদা , তোমার বাবার শরীরে আর তোমার শরীরেও তো একই রক্ত বইছে । তাই তোমাদের সব্বাইকে আমি শেষ করেই ছাড়বো ।" আমি তখন বললাম ," যারা তোমার বাবা-মাকে মেরেছে বলে তোমার ধারণা , তারাও তো আর এ পৃথিবীতে নেই । তাহলে আর শত্রুতা কেন ?" সে বলল , "তাদের তো আমি মারি নি ৷ তারা নিজেরাই রোগে মারা গেছে ৷" আমি বললাম ,"তুমি কি ওদের বদলাটা আমাদের মেরে তুলবে ভাবছো ?" সে ভয়ঙ্কর গলায় বলল , " ইউ আর ভেরি ইনটেলিজেন্ট !" আমি ওর মতিগতি দেখে বুঝতে পারলাম ,আমায় না মারা পর্যন্ত ও থামবে না ৷
আমি দেখলাম ,আমার হাতটা পেছন দিকে বাঁধা আছে , আর আমার প্যান্টের পেছনের পকেটে একটা আঙুলে পরা ছুরি ছিল ৷ সেটাকে সেই হাতবাঁধা অবস্থাতেই কোনরকমে পরে নিলাম ৷ তারপর মোটা দড়িটাকে কাটার চেষ্টা করলাম ৷ এমন সময় সে বলল , "দশ গোনার পর আমি তোমাকে শেষ করবো I আর টর্চার করবো না ৷" কথা বলা শেষ করে সে জোর গলায় কাউন্ট করতে শুরু করল- "এক-দুই-তিন-..." অপরদিকে আমি দড়িটাকে কাটার চেষ্টা করছি ৷ এভাবে সে আট বলে নয় বলবে , এমন সময় আমি দড়িটা কেটে জামার পকেট থেকে একটা বোমা বের ক'রে ওর দিকে ছুঁড়ে দিলাম । বোমাটা ফেটে গিয়ে চারদিকে ধোঁয়া হয়ে গেল । সে আমাকে দেখতে পেল না ৷ এই সুযোগে আমি সবার হাত-পায়ের বাঁধন খুলে দিলাম । যখন ধোঁয়াটা ঘর থেকে বাইরে বেরোচ্ছিল তখন আমি সুযোগ বুঝে এক দৌড়ে পিস্তলটা নিয়ে ওর পেছনে গেলাম ৷ ও বুঝতে পেরে পকেট থেকে ওর পিস্তলটা বের করেও ফেলেছিল ৷ সে সুযোগ আমি তাকে দিলাম না । পিছন থেকে সজোরে লাথি মারলাম ওর হাতে । পিস্তলটা ওর হাত থেকে ছিটকে গেল । আমি পেছন থেকে ওর গলাটা ধরে কপালে পিস্তল ঠেকিয়ে বললাম ,"একদম নড়বে না , নইলে খুলি উড়িয়ে দেব কিন্তু ।" তারপর চিৎকার করে পলাশ আর গোবিন্দকে ডাকতেই ওরা কয়েকজন কনস্টেবল নিয়ে এসে শয়তানটাকে ধরে থানায় নিয়ে গেল । আমিও তারপর বাইরে বেরিয়ে এলাম । আমাকে দেখে অপর্ণা বলল , "স্যার আপনি কীভাবে আপনার হাতে বাঁধা দড়িটাকে কেটেছিলেন ?" আমি বললাম , " বাংলায় একটা কথা আছে , অতিচালাকের গলায় দড়ি ৷ আসলে ও আমার সাথে অতিমাত্রায় চালাকি করতে গিয়ে , ওকে জব্দ করার রাস্তাটা ও-ই আমাকে দেখিয়ে দিয়েছে ৷ তাই কোন কাজ করবার আগে আগু-পিছু ভাবতে হয় , বুঝতে পারলে ?"


1 Comments
এতো ছোট্ট শার্লক হোমস
ReplyDeleteদারুন দারুন
রোজ লেখো