অগস্ত্য যাত্রা
মৌ-এর আজ শেষ পরীক্ষা,
রান্না করতে করতে বার বার-
ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে অনুসূয়া, এখনো দেড়টা বাজতে অনেক দেরি
বারোটা চল্লিশে ছুটি
ঠিক দেড়টায় পাড়ার মোড়ে এসে দাঁড়ায়-
হলুদ রঙের স্কুল বাস,
কোমরে আঁচল গুঁজে তাড়াতাড়ি কাজ সারে অনুসূয়া!
শাশুড়ি চুপচাপ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে,
কখনো কিছু বলে কখনো বা চুপ ;
কত কি যে ভাবে- কত সময় ছিল
আমাদের ছেলেদের
কত খেলা লুকোচুরি কিৎকিৎ কাবাডি
আরো কত খেলা
খেলার কোনো শেষ ছিল না
আর সন্ধ্যে হতেই হাতমুখ ধুয়ে
হ্যারিকেনের আলোয় চিৎকার করে পড়তে বসা
চোখ দুটো চিকচিক করে ওঠে শাশুড়ীর
'সৌমিত্র বলেছিল তাড়াতাড়ি আসবে, বৌমা"।
না না সব দায়িত্ব আমার মা
ফোন করে বলে দিল
আসতে পারবে না
ব্যাস দায়িত্ব শেষ
রান্না করো মেয়ে পড়াও তাকে তৈরি করাও
সৌমিত্রর নানা ফরমায়েশি
আপনিও তো খাটে শুয়ে শুয়েই থাকেন
হাত পা একদম নড়াবেন না
জানিনা কি হবে
গজ গজ করতে থাকে অনুসূয়া
'দেড়টা বাজতে চলল বৌমা',
অনুসূয়া কোন রকমের শাড়ি চেঞ্জ করে বেড়িয়ে যায়
মা শুয়ে শুয়ে তাকিয়ে থাকে দূরে।
বাস থেকে নামছে মৌ
মাকে দেখেই হাসিটা যেন মিলিয়ে গেলো
মা বুঝলো
বুঝতে পারল হাসিটা হারালো কেন
মিনিট পাঁচেকের হাঁটাপথ
মা হাত ধরে আছে মৌ-এর
মা খুব আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করে
'পরীক্ষা কেমন হয়েছে মৌ'?
মৌ চুপ ,মা বুঝে নেয়
ঘরে ঢুকতেই মা বলেন
'কোশ্চেন পেপার বেড় কর
আর তাড়াতাড়ি হাত মুখ ধুয়ে কাপড় চেঞ্জ করে এসো,,'
অনুসূয়া অস্থির
শাশুড়ি অন্য ঘরে শুয়ে ঠাকুর কে ডাকছে
মৌ কাপড় পাল্টে ভয়ে ভয়ে বসে অনুসূয়ার পাশে
'কোনটা পারোনি'?
' ফাইভ-জি '
'সার্থক পেরেছে '?
হ্যা,
'তুমি পারলে না কেন?
কাল রাতে এই প্রশ্নটাই তো বার বার মুখস্ত করালাম ',
মৌ চুপ
'কি হলো জবাব দিচ্ছ না '?মৌএর চোখ ছল ছল করছে
অনুসূয়া নিজেকে সংযত করে
মৌএর মাথায় হাতে রাখে
মৌ সাহস পায়
পারতাম মা, বলে মৌএর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে হুহু করে
'পারলে না কেন '?
'টাইম পেলাম না মা
আমি যে খুব স্লো মা '।
মা মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করে চুমু খায়
বলে 'স্লো হলে চলবে না মৌ
তোমাকে স্পিড আনতে হবে
তোমাকে ফার্স্ট হতে হবে
তোমাকে অনেক অনেক বড় হতে হবে।।
তোমার ওপরেই আমাদের সম্মান আমাদের ভবিষ্যৎ !!
'আমি প্রথম হলে তুমি খুব খুশি হবে মা,'
'হ্যাঁ ,খুব খুব খুশি হব
সবাই বলবে, আপনারা মৌসুমীর মা-বাবা!
আমরা বলব হ্যাঁ হ্যাঁ, ওই দেখো.......
আমাদের মেয়ে সবার আগে সবার প্রথমে,
ধ্রুবতারার মতো
সন্ধ্যার আকাশ জুড়ে একাই জ্বলজ্বল করবে তুমি
তাই তোমাকে জিততে হবে
সবাইকে হারাতে হবে
সার্থক প্রীতম অন্বেষা আকাঙ্ক্ষা......
সবাই সবাইকে হারিয়ে তোমাকে প্রথম হতেই হবে
তবেই না আমাদের স্বপ্ন সফল হবে !
তোমার বাবার এই হাড়ভাঙ্গা খাটুনির মূল্য পাবে,
বলো পারবে তো মৌ? পারবে তো?
পারবে তো ওদের হারাতে?
কিন্তু ওরা আমার বন্ধু মা!
মৌ, পড়াশুনায় কম্পিটিশনে নিজের লক্ষ্যে,
কেউ কারো বন্ধু হয় না
সবাই প্রতিযোগী প্রতিদ্বন্দ্বী।।
কিন্তু মা আমার খুব ছোট্ট বেলায়,
আমি যখন খুব অসুস্থ
প্রায় মৃত্যুর কাছাকাছি দাঁড়িয়ে !
তুমিই তো বলেছিলে মা,
সার্থকের মা-বাবা দিনের পর দিন
রাত জেগে, আমাদের অর্থ সাহায্য করে
আমার প্রাণ বাঁচিয়েছেন !
তুমি তো বলেছিলে মা,
এমন মানুষ হয় না!
ঠাকুর যেন ওদের মঙ্গল করুক,
তুমিই তো বলতে মা।।
অনুসূয়া মৌকে আদর করে
জড়িয়ে ধ'রে
দুজনেরই চোখ দিয়ে জলগড়িয়ে পড়ে অজস্র ধারায়,
শাশুড়ি জিজ্ঞেস করে
সৌমিএের কি আসতে দেরি হবে বৌমা?
অনুসূয়া জবাব দেয় না।
মৌ এর চুলে হাত বোলাতে বোলাতে
জানালার বাইরের দিকে তাকিয়ে বলল,
"এটাই তো জীবন মৌ! এটাই জীবন!
সামনে তোমার শুধুই প্রতিদ্বন্দ্বী!
তাই তো মৌ
সব সময়ই নিজেকে এগিয়ে রাখতে হবে,
নাহলে তোমায় পিছিয়ে পড়তে হবে
কথা দাও মৌ
পারবে তো আমাদের জীবন সফল করতে সার্থক করতে"?
হ্যাঁ মা পারবো,
তোমাদের খুশি করতে ----
পারতে যে আমাকে হবেই মা !
ম্যামরাও আমার দিকে তাকিয়ে আছে মা,
স্কুলের প্রতিটি শিক্ষক আমাকে ডেকে ডেকে জিজ্ঞেস করে----
পারবে তো মৌসুমী? পারবে?
আমাদের অনেক অনেক স্বপ্ন তোমাকে ঘিরে
তুমি ক্লাসের ফাস্ট গার্ল
আমাদের নাম স্কুলের নাম
তোমার মা-বাবার নাম সার্থক করতে
তোমাকে পারতেই হবে মৌসুমী,।
হ্যা মা, আমি পারবো
পারতে আমাকে হবেই
যেকোনো মূল্যে আমাকে প্রথম হতেই হবে
আমি ছুটবো মা
টগবগ টগবগ করে ছুটবো
যেমন করে একদিন ছেলেবেলায় ঘোড়ার রেসে সার্থককে হারিয়েছিলাম
তুমি কত খুশি হয়েছিলে মা
সেদিন তুমি কত কি রান্না করে খাইয়ে ছিল
সেদিন বাবা প্রকাশ না করলেও
আমার জন্য আমার প্রিয় টেডি বিয়ারটা কিনে এনে দিয়েছিলেন
মা জানি,,আমি পারলে তুমি খুশি হবে বাবা খুশি হবে স্কুল-কলেজ
সবাই সবাই খুশি হবে
তাই আমাকে পারতেই হবে
এই দেখো মা আমি ছুটছি আমি ছুটছি আমি ছুটছি
বলতে বলতে মৌ মায়ের কোলে ঢলে পড়ে
শাশুড়ি দরজায় দাঁড়িয়ে ফিরে যেতে যেতে বলে
বৌমা তোমরা যে কোথায় যাচ্ছ ! কোথায় যে যাবে !
অনুসূয়া এক হাতে মৌএর চুলে
হাত বোলাতে বোলাতে স্বগোক্তি করে
জানিনা মা, জানি না,
অন্য হাতে জানালার রড ধরে
বাইরের আকাশের শূণ্যতায় তাকিয়েই
অসহায় ভাবে ঝরঝর করে কাঁদতে কাঁদতে
জানালায় মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে ।।


0 Comments