কংসাবতী
উঁচু নিচু ঢাল, আবার কিছুটা সমতল, একটু একটু করে ঢালু হয়েছে, আবার উঠেছে ,তার পর উঁচু পাড়ের মতো সোজা চলে গেছে লাল কাঁকুড়ে ক্ষয়া ক্ষয়া পথ ,একটু বাঁক নিলেই অপূর্ব সৌন্দর্য অপেক্ষা করে এই পথের দুপাশে ঘন হয়ে ফুটে আছে কাশফুল ৷ খাঁ-খাঁ দুপুরে মনে হবে এখানে প্রকৃতি রুক্ষ লাল শাড়ীতে সাদা পাড় নীচে বয়ে চলেছে শীতল কংসাবতী ৷
পুরুলিয়া জেলার ঝালদার মুরুগুমা অঞ্চলে উঁচু পাহাড় ঝাবরবন কাঁসাই নালার আকারে কংসাবতী নদীর উৎপত্তি ৷
ক্যালেন্ডারে অক্টোবর চলে গেলেও শীত আসতে ঢের দেরি, দীর্ঘ দুপুর শেষ হতে চলেছে আর কিছু দিন পরেই পর্যটক দের ভিড় শুরু হয়ে যাবে নদীর পারে সোহরাই উৎসবে ৷
সপ্তাহে এক দিন হাট বসে নদীর ধারে৷
বড় চার চাকার গাড়ী এরাস্তা দিয়ে যাওয়ার ঝুকি নেয়না সচরাচর,পথে গোটা কতক মানুষ জঙ্গল থেকে কাঠের বোঝা মাথায় করে ফিরছে ৷
কাচা রাস্তায় মাল বোঝাই গরুর গাড়ীর চাকার দাগ কাঁকুড়ে মাটির উপর বিচিত্র নকশা তৈরী করেছে৷
এবড়ো খেবড়ো পথের টাল সামলাতে সামলাতে সাদা ট্যক্মি গাড়ী টা এ দিকেই বাঁক নিয়ে দাঁড়ালো ৷
মনি কনের সাজে বসে আছে, অভাবের সংসারে চার ভাই বনের মধ্যে সে বড়ো, দেখতে বেশ সুন্দর ৷ তাই হয়তো বর পক্ষ পণ চায়নি,হঠাৎ মনির ভাই ছুটতে ছুটতে এলো দিদি তোর বর এসে গেছে সাদা ট্যক্মি করে৷তোর খুব মজা তাই না রে দিদি!? বিয়ে হয়ে গেলে শহরে চলে যাবি,সেখানে কত কি দেখবি,কত ভালো-ভালো খাবি,আমরাও গিয়ে তোর কাছে থাকবো ৷রাগ অভিমান মিশিয়ে কি যে অনুভূতি হচ্ছে তা আর
মনি বলতে পড়লো না ভাইকে, ওরা যদি না থাকতো হয়তো এত তাড়াতাড়ি ওর বিয়ে দিতো না বাবা মা,যদিও ওদের এখানে কোন দোষ নেই ৷
ছমাস আগেই এক দুপুরে কয়েক টা ট্যক্মি মারুতি এসে ছিলো ওদের বাড়ীর সমনে,খোঁজ করে ছিলো মনিমালা হাঁসদা'র বাড়ী,গ্রামের মোড়ল,স্কুলের মাস্টার মশাই'রা বলেছিলো ওগুলো টিভি চ্যানেল খবরের কাগজের গাড়ী ৷ওই সব শহুরে মানুষ দের কাছ থেকেই গ্রামের সবাই জানতে পেড়েছিলো মনি মাধ্যমিকে খুব ভাল ফল করেছে৷সে কত উপহার! কত আশ্বাস! তারা নাকি পড়ানোর খরচ দেবে, কেউ কেউ বলেছিলো খওয়া খরচ ও দেবে, কোথায় কে! খবরের কাগজের পাতা ঠোঙা হয়ে গেলো আশ্বাসও উড়ে গেলো৷
হঠাৎ করেই মনির মনে কালো মেঘ জমাট বাঁধে,পড়াশুনোর পাঠ এখানেই শেষ,দিন পনেরো অগে সহপাঠী বন্ধু রঞ্জা বিয়ের পর এসে মনির সাথে গল্প করতে-করতে বলে ছিলো ফুল শষ্যার রাত কত ভয়ঙ্কর হয়;
মনির শাশুড়ী খুব ট্যক-ট্যক করে কথা বলে,বরের চেহারা বিশাল লম্বা- মোটা-কালো,মনির থেকে পনেরো ষোলো বছরের বড়ো হবে৷বরের আগে বিয়ে ছিলো,সেই বৌ অসুখে মারা গেছে ৷ শহরতলি'তে নিজেদের পৈত্রিক বাড়ী,বাড়ীতেই কারখানা আছে ৷
মনি জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে চারিদিকে ফুল দিয়ে সাজানো খাটে,সুন্দর ভাবেই বিয়ে মিটে গেছে দেওড়িতে বসে শুভদৃষ্টির সময় ভয়ঙ্কর চেহারার বরের দিকে এক ঝলক তাকিয়েই চোখ সরিয়ে নিয়েছে৷ হঠাৎ চমকে উঠলো মনি,দরজায় খিল দেওয়ার আওয়াজে৷ কয়েক দিনের বিয়ের ধকলে ওর চোখ লেগে গেছিল ঘুমে,বর অর্থাৎ অসীম খাটে এসে বসলো,মনি আরো আড়ষ্টো হয়ে গেলো৷ অসীম বললো তুমি ভয় পাচ্ছ কেনো?! এটা তো এখন থেকে তোমারও বাড়ী!নিজের মত থাকবে, অামার ভাই বোনদের সাথে গল্প করবে,দুই ভাই আমাকে সাহায্য করে কারখানার,খুবই ছোট ব্যবসা;পোড়া মাটির ঘোড়া, শঙ্খ ,ফুলদানি তৈরী করে বিভন্ন দোকানে পাইকারী বিক্রি করি৷ মা আর আমি খুব অভাবের সাথে লড়ে- দাঁড়করিয়েছি এই ব্যবসা৷
অসীম বলে উঠলো আরে মনিমালা তুমি তো কোনো কথাই বলছো না! আমি একা একাই বলে যাচ্ছি,অবশ্য আমাকে তোমার তো পছন্দ হয়নি, আমি দেখতে খারাপ! শুভদৃষ্টির সময় তো একরাশ বিরক্তি নিয়ে তাকিয়েই- মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিলে, লজ্জায় দুটো হাত কলের মধ্যে আরো জড়োসড়ো করে নিলো মনি, অসীম বললো ওহ্ তুমি মাধ্যমিকে খুব ভালো ফল করেছ তো,অস্ফুষ্ট ভাবে মনি বললো আর পড়া হবে না, হো-হো করে হেসে উঠলো অসীম, কেনো হবে না?! আমার ভাইতো তোমার ক্লাসেই পড়ে,ওর সাথে তুমিও পড়বে, এখানকার স্কুলে ভর্তি করে দেবো,এতক্ষনে মনির একটু জড়োতা কমলো ৷ আবার অসীম বললো আমি উচ্চমাধ্যমিকটা শেষ করতে পাড়িনি, তখন বাবা মারা গেলেন সংসার ধরতে হলো,ছোট ছোট ভাই বোন,জানো! এখন খুব ইচ্ছা করে আবার অনেক অনেক বই পড়তে,কাজের ফাঁকে ভাই বোনদের মাঝে মধ্যে পড়া দেখিয়ে দেই,তুমি চাইলে!তোমাকেও সাহায্য করতে পাড়ি, মা একটু রাগি খিট-খিটে, অভাব অনটনে এমন হয়ে গেছে,তোমার স্কুলে যাওয়ার কথা আমি বুঝিয়ে বললে আমার কথা মা ফেলতে পাড়বেনা৷তোমায় উচ্চমাধ্যমিক দিতে হবে তো!অসীমের ভেতর থেকে বেড়িয়ে এলো আবদারের সাথে কথা গুলো, এতক্ষনে মনির চোখ থেকে টপ-টপ করে জল পড়ছে,এ কান্না কিসের তা সে জানেনা, সব রাগ অভিমান ভেসে গেলো কংসাবতীর জলে,মনি এই প্রথম অসীমের দিকে ভালোভাবে তাকালো,এই দৃষ্টি হয়তো শুভদৃষ্টি! পূর্ণিমার স্নিগ্ধ চাঁদের আলো ধুয়ে যাচ্ছে কংসাবতীর জলে__________


7 Comments
বেশ ভালো লাগলো বোন
ReplyDeleteবাহঃ খুব ভালো, এইরকম সমাজ হলে কতো ভালো হতো।।
ReplyDeleteঅপূর্ব অসাধারন লেখনী শৈল্য মুগ্ধতা পেলাম পড়ে ৷
ReplyDeleteঅপূর্ব মন ছোঁয়া লেখা । খুব ভালো লাগলো অলিপা। শুভেচ্ছা অফুরান ।
ReplyDeleteঅপূর্ব মন ছোঁয়া লেখা ।খুব ভালো লাগলো অলিপা। শুভেচ্ছা অফুরান ।
ReplyDeleteখুব সুন্দর ।
ReplyDeleteআপনার লেখাটা পড়লাম। বেশ ভালো লাগলো। কোন ভালোর যেমন শেষ নেই তাই আরও ভালোর অপেক্ষায় রইলাম।
ReplyDelete