শামসুর রহমান



শামসুর রাহমান
 (২৩ অক্টোবর ১৯২৯ - ১৭ আগস্ট ২০০৬) 

বাংলাদেশ ও আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগে দুই বাংলায় তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ও জনপ্রিয়তা প্রতিষ্ঠিত। তিনি একজন নাগরিক কবি ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ওপর লিখিত তাঁর দুটি কবিতা খুবই জনপ্রিয়। তিনি মজলুম আদিব (বিপন্ন লেখক) ছদ্মনামে লিখতেন।

 ।। কবিতা। ।

একটি ফটোগ্রাফ

‘এই যে আসুন, তারপর কী খবর?  
 আছেন তো ভাল? ছেলেমেয়ে?’ কিছু আলাপের পর  
 দেখিয়ে সফেদ দেয়ালের শান্ত ফটোগ্রাফটিকে  
 বললাম জিজ্ঞাসু অতিথিকে–  
 ‘এই যে আমার ছোট ছেলে, যে নেই এখন,  
 পাথরের টুকরোর মতন  
 ডুবে গেছে আমাদের গ্রামের পুকুরে  
 বছর-তিনেক আগে কাক-ডাকা গ্রীষ্মের দুপুরে।’  
  
 কী সহজে হয়ে গেল বলা,  
 কাঁপলো না গলা  
 এতটুকু, বুক চিরে বেরুলো না দীর্ঘশ্বাস, চোখ ছলছল  
 করলো না এবং নিজের কন্ঠস্বর শুনে  
 নিজেই চমকে উঠি, কি নিস্পৃহ, কেমন শীতল।  
 তিনটি বছর মাত্র তিনটি বছর  
 কত উর্ণাজাল বুনে  
 কেটেছে, অথচ এরই মধ্যে বাজখাঁই  
 কেউ যেন আমার শোকের নদীটিকে কত দ্রুত রুক্ষ চর  
 করে দিলো। অতিথি বিদায় নিলে আবার দাঁড়াই  
 এসে ফটোগ্রাফটির প্রশ্নাকুল চোখে,  
 ক্ষীয়মান শোকে।  
  
 ফ্রেমের ভেতর থেকে আমার সন্তান  
 চেয়ে থাকে নিষ্পলক,তার চোখে নেই রাগ কিংবা অভিমান। 
  
====== 

কোন এক জনের জন্য


এতকাল ছিলাম একা আর ব্যথিত,  
 আহত পশুর অনুভবে ছেঁড়াখোঁড়া।  
 দুর্গন্ধ-ভরা গুহাহিত রাত নিস্ফল ক্রোধে দীর্ণ,  
 শীর্ণ হাহাকার ছাড়া গান ছিল না মনে,  
 জানি প্রাণে ছিল না সতেজ পাতার কানাকানি  
 এমনকি মরম্নভূমির তীব্রতাও ছিল না ধমনীতে,  
 স্বপ্ন ছিল না,  
 ছিল না স্বপ্নের মতো হৃদয়।  
  
 কে জানতো এই খেয়ালি পতঙ্গ, শীতের ভোর,  
 হাওয়ায় হাওয়ায় মর্মরিত গাছ,  
 ঘাসে-ঢাকা জমি, ছায়া-মাখা শালিক  
 প্রিয় গানের কলি হয়ে গুঞ্জরিত হবে  
 ধমনীতে, পেখম মেলবে নানা রঙের মুহূর্তে।  
 কে জানতো লেখার টেবিলে রাখা বাসি রম্নটি  
 আর ফলের শুকনো খোসাগুলো  
 তাকাবে আমার দিকে অপলক  
 আত্মীয়ের মতো? 
  
====== 

সাইক্লোন

চাল উড়ছে, ডাল উড়ছে  
 উড়ছে গরু, উড়ছে মোষ।  
 খই উড়ছে, বই উড়ছে  
 উড়ছে পাঁজি, বিশ্বকোষ।  
  
 ময়লা চাদর, ফরসা জামা,  
 উড়ছে খেতের শর্ষে, যব।  
 লক্ষ্মীপ্যাঁচা, পক্ষীছানা  
 ঘুরছে, যেন চরকি সব।  
  
 মাছ উড়ছে, গাছ উড়ছে  
 ঘুর্ণি হাওয়া ঘুরছে জোর।  
 খাল ফুলছে, পাল ছিঁড়ছে  
 রুখবে কারা পানির তোড়?  
  
 হারান মাঝি, পরান শেখ  
 বাতাস ফুঁড়ে দিচ্ছে ডাক।  
 আকাশ ভেঙে কাঁচের গুঁড়ো  
 উঠল আজান, বাজল শাখ।  
  
 চম্পাবতীর কেশ ভাসছে  
 ভাসছে স্রোতে খড়ের ঘর।  
 শেয়াল কুকুর কুঁকড়ো শালিক  
 ডুবল সবই, ডুবলো চর। 
  
====== 

অভিশাপ দিচ্ছি

আজ এখানে দাড়িয়ে এই রক্ত গোধূলিতে  
 অভিশাপ দিচ্ছি।  
 আমাদের বুকের ভেতর যারা ভয়ানক কৃষ্ঞপক্ষ  
 দিয়েছিলো সেঁটে,  
 মগজের কোষে কোষে যারা  
 পুতেছিলো আমাদেরই আপনজনের লাশ  
 দগ্ধ, রক্তাপ্লুত,  
 যারা গনহত্যা  
 করেছে শহরে গ্রামে টিলায় নদীতে ক্ষেত ও খামারে  
 আমি অভিশাপ দিচ্ছি নেকড়ের চেয়েও অধিক  
 পশু সেই সব পশুদের।  
 ফায়ারিং স্কোয়াডে ওদের  
 সারিবদ্ধ দাঁড়  
 করিয়ে নিমিষে ঝা ঝা বুলেটের বৃষ্টি  
 ঝরালেই সব চুকে বুকে যাবে তা আমি মানিনা।  
 হত্যাকে উতসব ভেবে যারা পার্কে মাঠে  
 ক্যাম্পাসে বাজারে  
 বিষাক্ত গ্যাসের মতো মৃত্যুর বীভতস গন্ধ দিয়েছে  
 ছড়িয়ে,  
 আমি তো তাদের জন্য অমন সহজ মৃত্যু করিনা  
 কামনা।  
 আমাকে করেছে বাধ্য যারা  
 আমার জনক জননীর রক্তে পা ডুবিয়ে দ্রুত  
 সিড়ি ভেন্গে যেতে আসতে  
 নদীতে আর বনবাদাড়ে শয্যা পেতে নিতে  
 অভিশাপ দিচ্ছি আজ সেইখানে দজ্জালদের। 
  
====== 

বাইবেলের কালো অক্ষর গুলো

জো, তুমি আমাকে চিনবে না। আমি তোমারই মতো 
 একজন কালো মানুষ গলার সবচেয়ে 
 উঁচু পর্দায় গাইছি সেতুবন্ধের গান, যে গানে 
 তোমার দিলখোলা সুরও লাগছে। 
 জো, যখন ওরা তোমার চামড়ায় জ্বালা-ধরানো 
 সপাং সপাং চাবুক মারে আর 
 হো হো করে হেসে ওঠে, 
 যখন ওরা বুটজুতোমোড়া পায়ে মারে তোমাকে, 
 তখন ধূলায় মুখ থুবড়ে পড়ে মানবতা। 
 জো, যখন ওরা তোমাকে 
 হাত পা বেঁধে নির্জন রাস্তায় গার্বেজ ক্যানের পাশে 
 ফেলে রাখে, তখন ক্ষ্যাপাটে অন্ধকারে 
 ভবিষ্যৎ কাতরাতে থাকে 
 গা’ ঝাড়া দিয়ে ওঠার জন্যে। 
 যদিও আমি তোমাকে কখনো দেখিনি জো, 
 তবু বাইবেলের কালো অক্ষরের মতো তোমারদুফোঁটা চোখ 
 তোমার বেদনার্ত মুখ বারংবার 
 ভেসে ওঠে আমার হৃদয়ে, তোমার বেদনা 
 এশিয়া, আফ্রিকা আর লাতিন আমেরিকায় ব্যাপ্ত, জো। 

===========




Post a Comment

0 Comments