সোমনাথ ঘোষাল





(গল্প)
ফুরুত


প্রতিদিন বাড়ি থেকে বেড়িয়ে বাসস্ট্যান্ডে এসে চা সিগারেটের দোকানটায় সিগারেট কিনি, সময় থাকলে কোনো কোনো দিন একটা ধরিয়ে তৃপ্তির সুখটান দিয়ে মগজ ধোলাই করি।

ইদানিং সকালে দোকানে সিগারেট কিনতে গেলে একটি আট, ন-বছরের বাচ্চা ছেলে কোলে বছর খানেকের একটা বাচ্চাকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। দোকানে আসা যাওয়া মানুষদের কাছে খাবার চায়। কেউ পয়সা দিলে নেয় না। খাবার কিনে দিতে বলে। কয়েক-দিন আমার কাছেও হাত পেতেছে, কিন্তু আমার তাড়া থাকায় চলে গেছি।

সেদিন শনিবার অফিস ছুটি, তবু বিশেষ একটা কারনে বেড়ােতে হলো। তেমন তাড়া নেই, চায়ের দোকানে সামনে এসে দাঁড়ালাম। দেখি ছেলেটি বাচ্চাটাকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখে কাছে এগিয়ে এসে বললো, খাবার কিনে দাও খাবো। রোজ চলে যাও আজ কিনে দিতে হবে।
আমি অবাক ওর কথা শুনে, এ বলে কিরে, সরাসরি জোড় করছে ! হেসে বললাম, কি খাবি ?
ও বললো, ঘুগনি, পাউরুটি আর বোনুর জন্য, একটা বিস্কুটের বয়াম দেখিয়ে, ওটা দেবে।
আমি দোকানদার হারুদাকে ও যা যা চাইছে দিতে বলে, সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে পয়সা মিটিয়ে বাস ধরতে হাঁটা দিলাম।

রবিবার ছুটির দিন, একটু দেড়ি করে ঘুম থেকে উঠেছি। বাজারের ব্যাগটা নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হারুদার চায়ের দোকানে এলাম একটা চা সিগারেট খেয়ে বাজারটা করবো বলে। দেখি ছেলেটি বাচ্চাটাকে ছেঁড়া কাপড়ে জড়িয়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখে কাছে এগিয়ে এলো। আমি সিগারেটটা  ধরিয়ে চায়ে চুমুক দিয়ে বললাম, বল কি খাবি ?
ও বললো, বোনুটার জ্বর হয়েছে ডাক্তাখানায় নিয়ে যাবে?
আমি প্রথমটা হকচকিয়ে গেলাম। তারপর নিজেকে একটু সামলিয়ে বাচ্চাটার গায়ে হাত দিয়ে দেখি গা বেশ গরম ডাক্তার দেখানো খুবই দরকার। আজ আবার রবিবার সব ডাক্তাখানা বন্ধ। তবে এই সামনেই ডাঃ পালের বাড়ি সহ চেম্বার, বাড়িতে পেলেও ওনাকে পাওয়া যাবে।

ডাঃ পালের বাড়ি থেকে বাচ্চাটাকে দেখিয়ে বাইরে এসে ওষুধ কিনে ছেলেটার হাতে দিয়ে কখন কখন ওষুধ খেতে হবে বুঝিয়ে দিলাম। যাবার সময় কিছু টাকা ওর হাতে দিতে গেলে ও নিলো না। বললো, তোমার কাছে থাক, আমার কাছে থাকলে রাতে বাবা মদ খেয়ে এসে সব টাকা নিয়ে নেবে।
আমি অবাক হয়ে বললাম, তোর মা? 
ও বললো, বোনু  হবার পরই মা কোথায় যেন চলে গেছে। বাবা খুব মারতো তো তাই। আমাকেও মারে, আমিও চলে যাবো শুধু বোনুর জন্য যেতে পারি না। আমি না থাকলে বাবা বোনুকে হয়তো মেরেই ফেলবে।
আমি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বললাম, তুই থাকিস কোথায়?
ও ওর ছোট্ট হাত খানা তুলে আঙ্গুল দেখিয়ে বললো, ঐ যে ব্রীজ ওর নিচে।
আমি বললাম, ঠিক আছে আমি চললাম। রোজই দেখা হবে, কোনো অসুবিধা হলে আমাকে জানাবি। আর হ্যাঁ তোর নামটা তো জানা হলো না। কি নাম তোর?
ও আমার চোখে চোখ রেখে বললো, আমার নাম ফুরুত।
আমি হেসে বললাম, ফুরুত ! কে দিয়েছে এই নাম?
ও বললো, জানিনা।

অফিসের কাজে এক সপ্তার জন্য বাইরে গেলাম। ফিরে এসে এতো কাজের চাপ যে হারুদার চায়ের দোকানে যাবার সময় পেলাম না।
সেদিন অফিস থেকে ফিরতে একটু রাত হলো। বাসষ্টপে বাস থেকে নেমেই দেখি ফুরুত ওর বোনুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমার চোখে চোখ পড়তেই ও এগিয়ে এলো। এই কদিনে ও যেনো কেমন পাল্টে গেছে। ফ্যাকাসে মুখ, কোটরে ঢোকা চোখ, উস্কোখুস্কো চুল। কেমন জীর্ন শরীর।  আমি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বললাম, তোর একি দশা হয়েছে ! তোর বোনু এখন কেমন আছে?
ও মাথা নেড়ে বললো, বোনু ভালো আছে। কিন্তু আমার শরীরটা ভালো নেই।
আমি বললাম, ঠিক আছে আমি কালকে তোকে ডাক্তাখানায় নিয়ে যাবো।
ও মাথা নাড়লো।
আমি আবার বললাম, কিছু খাবি?
ও মাথা নেড়ে না বলে, আমাকে বললো, আমার বোনুকে একটু ধরো তো, ও দিকটায় যাবো আর আসবো।
অনিচ্ছা স্বত্বেও ফুরুতের কথা ফেলতে পাড়লাম না। ও ওর বােনুকে আমার কাছে দিয়ে দৌড়ে অন্ধকারে কোথায় যেন মিলিয়ে গেলো।

মিনিট পেরিয়ে ঘন্টা কাটলো, ফুরুতের  কোনো দেখা নেই। এদিকে রাত বাড়ছে বাড়ি থেকে ঘন ঘন ফোন আসছে, আমি এখন কি করবো এই বাচ্চাটাকে নিয়ে?  আমার মাথায় সব তাল গোল পাকিয়ে গেলো।  অগত্যা ব্রীজের নিচে বস্তিতে পা বাড়ালাম। ঘুঁটঘুঁটে অন্ধকার বাইরের আবছা আলোয় ছোট ছোট মশারী তাঁবুর মতো টাঙ্গানো। একটা গা ঘিন ঘিন করা আঁশটে গন্ধ। এমন করেও মানুষ বেঁচে থাকে আমি এই প্রথম দেখলাম। রাত বেশ হয়েছে, চারিদিকে শুনশান কি যে করবো মাথায় ঢুকছে না। এদিকে বাচ্চাটা সমানে কেঁদে চলেছে। ফুরুতের ওপর ভীষন রাগ হলো। এখন সামনে পেলে একটা চড় মারতাম।
কয়েক মিনিট দোনোমোনো করার পর মনে বল এনে ফুরুতের নাম ধরে চিৎকার করে ডাকতে লাগলাম। বেশ কয়েকবার ডাকার পর একটা মশারী মধ্যে থেকে একটা মাতালের মাথা বেড়িয়ে এলো। সে জড়ানো গলায় বললো, কে, কে ডাকছে ফুরুত ফুরুত বলে, ফুরুত কি বেঁচে আছে যে সাড়া দেবে।
আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। এ মাতাল বলে কি ! তবু আমি আবার বললাম, ফুরুত কোথায়?
মাতাল এবার চিৎকার করে বললো, বলছি না ফুরুত মরে গেছে, আমি ওর বাবা। ও চারদিন আগে জ্বরে মরে গেছে।
এসব শুনে ভয়ে আমার হাত পা কাঁপতে লাগলো, শরীর ঠান্ডা হয়ে গেলো। তাহলে আমার কাছে ও এসেছিলো ওর বোনুকে রাখবে বলে ! প্রথমে ভাবলাম বাচ্চাটাকে ওখানে রেখে চলে যাই। কিন্তু পরক্ষণে বিবেকে ধাক্কা খেলাম। ওখানে দাঁড়িয়ে বাড়িতে ফোন করে বললাম, যেতে দেরী হবে, চিন্তা না করতে।

সে রাতে থানায় গিয়ে বড় বাবুর সাথে কথা বললাম, মিথ্যে বললাম, ফুরুতের ব্যাপারটা পুরো চেপে গেলাম। বাচ্চাটাকে কুড়িয়ে পেয়েছি, একটা ব্যবস্হা করে দিন। উনি সাহায্যের হাত বাড়ালেন। সে রাতে বাচ্চাটাকে হোমে রাখা হলো। মাঝে মধ্যে তাকে দেখার অনুমতিও পেলাম।
হোমের সমস্ত কাজকর্ম শেষ করে বাচ্চাটাকে রেখে যখন বাইরে এলাম তখন গভীর রাত। পুলিশের ভ্যান গাড়ি আমাকে নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। সেই মুহুত্বে ফুরুতের হাসিমাখা মুখটা দেখতে পেলাম। ও যেন আমাকে বলছে, আমি জানতাম তুমিই আমার বোনুর একটা ব্যবস্হা করবে।

                        ((সমাপ্ত))

Post a Comment

2 Comments

  1. অসাধরন। মন ভরে গেলো

    ReplyDelete
  2. Golpo ta polar sese mukhe hasi amnitai asa galo.

    ReplyDelete